যানজট কমাতে ভূগর্ভস্থ পরিবহন নেটওয়ার্ক, চালকবিহীন গাড়ি ও উড়ন্ত ট্যাক্সির সমন্বিত পরিকল্পনা করছে দুবাই। ২০৩০ সালের মধ্যে মোট যাত্রার ২৫ শতাংশ স্বয়ংক্রিয় পরিবহনব্যবস্থার আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে শহরটির কর্তৃপক্ষ।
দুবাইয়ে যাতায়াতব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে ভূগর্ভ, ভূপৃষ্ঠ ও আকাশপথকে সমন্বিত করে ত্রিমাত্রিক পরিবহন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। এর আওতায় মাটির নিচে বিশেষ টানেলে বৈদ্যুতিক গাড়িতে যাত্রী পরিবহন, সড়কে চালকবিহীন গাড়ির ব্যবহার এবং আকাশপথে উড়ন্ত ট্যাক্সি চালুর উদ্যোগ রয়েছে।
দুবাইয়ের সড়ক ও পরিবহন কর্তৃপক্ষের (আরটিএ) মহাপরিচালক ও নির্বাহী পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান মাত্তার আল তায়ের ২০২৬ সালের মোহাম্মদ বিন রশিদ নেতৃত্ব ফোরামে এ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। তাঁর মতে, শহরের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা ও পরিবহন চাহিদা সামাল দিতে প্রচলিত সড়ক ও গণপরিবহনের পাশাপাশি বিকল্প যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।
ভূগর্ভে তৈরি হতে পারে নতুন পরিবহন নেটওয়ার্ক
দুবাইয়ের পরিবহন অবকাঠামো সম্প্রসারণে এবার মাটির নিচের জায়গা ব্যবহারের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে আরটিএ। প্রস্তাবিত এ ব্যবস্থায় যাত্রীদের পাশাপাশি পণ্য ও সেবা পরিবহনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ভূগর্ভস্থ পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে সড়কের ওপর যানবাহনের চাপ কমানো, বাণিজ্যিক পণ্য সরবরাহ সহজ করা এবং আবাসিক ও ব্যবসায়িক এলাকাগুলোর মধ্যে যোগাযোগ উন্নত করা সম্ভব হতে পারে। তবে সমন্বিত ভূগর্ভস্থ নেটওয়ার্কটির চূড়ান্ত রুট, ব্যয় ও বাস্তবায়নের সময়সূচি এখনো নির্ধারিত হয়নি।
দুবাই লুপ প্রকল্পে বৈদ্যুতিক গাড়িতে যাত্রা
ভূগর্ভস্থ পরিবহনের অন্যতম উদ্যোগ হলো দুবাই লুপ। দুবাইয়ের সড়ক ও পরিবহন কর্তৃপক্ষ এবং দ্য বোরিং কোম্পানির সহযোগিতায় প্রকল্পটি এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
এ প্রকল্পে বিশেষ টানেলের ভেতর দিয়ে বৈদ্যুতিক গাড়িতে যাত্রী পরিবহনের কথা বলা হয়েছে। এর ফলে নির্দিষ্ট গন্তব্যের মধ্যে তুলনামূলক সরাসরি পথে যাতায়াতের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে দুবাই লুপকে চালু গণপরিবহনব্যবস্থা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। প্রকল্পটির বাস্তব সুফল নির্ভর করবে নির্মাণকাজ, নির্ধারিত রুট, যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতা এবং অন্যান্য গণপরিবহনের সঙ্গে সংযোগের ওপর।
২০.৫ বিলিয়ন দিরহামের মেট্রো ব্লু লাইন
দুবাইয়ের গণপরিবহন নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে ২০.৫ বিলিয়ন দিরহাম ব্যয়ে মেট্রো ব্লু লাইন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ এ রেলপথে থাকবে ১৪টি স্টেশন। এর মধ্যে প্রায় ১৫.৫ কিলোমিটার অংশ থাকবে ভূগর্ভে।
প্রকল্পটির মাধ্যমে ইন্টারন্যাশনাল সিটি, দুবাই সিলিকন ওসিস, অ্যাকাডেমিক সিটি, মিরদিফ ও আল ওয়ারকার মতো এলাকায় গণপরিবহনের যোগাযোগ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্পটি ২০২৯ সালের ৯ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সম্পন্ন করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এটি চালু হলে সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোর বাসিন্দাদের যাতায়াত সহজ হওয়ার পাশাপাশি ব্যক্তিগত গাড়ির ওপর নির্ভরতা কমতে পারে।
৩৪ বিলিয়ন দিরহামের মেট্রো গোল্ড লাইন
দুবাইয়ের বৃহৎ পরিবহন প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে মেট্রো গোল্ড লাইন। ৩৪ বিলিয়ন দিরহাম ব্যয়ের এ প্রকল্পের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে ২০২৬ সালের এপ্রিলে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, গোল্ড লাইন হবে ৪২ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং এতে থাকবে ১৮টি স্টেশন। প্রকল্পটি ২০৩২ সালের ৯ সেপ্টেম্বর চালুর লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে পরিকল্পিত হয়েছে।
নতুন এ রেলপথ দুবাইয়ের সম্প্রসারিত নগরাঞ্চল ও অর্থনৈতিক কেন্দ্রগুলোর মধ্যে যোগাযোগ বাড়াতে ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে এর সুফল নির্ভর করবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করা এবং বিদ্যমান পরিবহন নেটওয়ার্কের সঙ্গে কার্যকর সংযোগ স্থাপনের ওপর।
চালকবিহীন গাড়ি ও উড়ন্ত ট্যাক্সি
দুবাইয়ের পরিবহন পরিকল্পনায় শুধু ভূগর্ভস্থ টানেল ও মেট্রো নয়, চালকবিহীন গাড়ি এবং উড়ন্ত ট্যাক্সিও গুরুত্বপূর্ণ স্থান পাচ্ছে।
কর্তৃপক্ষের লক্ষ্য, ২০৩০ সালের মধ্যে শহরের মোট যাত্রার ২৫ শতাংশ স্বয়ংক্রিয় পরিবহনব্যবস্থার আওতায় আনা। এ লক্ষ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উন্নত যানবাহন প্রযুক্তি ও ডিজিটাল অবকাঠামো ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।
আরটিএর তথ্য অনুযায়ী, দুবাইয়ে স্বয়ংক্রিয় ট্যাক্সি চার মিলিয়ন কিলোমিটারের বেশি পথ অতিক্রম করেছে। অন্যদিকে, উড়ন্ত ট্যাক্সি চালুর প্রস্তুতিও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন ও অবকাঠামো উন্নয়নের অগ্রগতি থাকলেও নিয়মিত বাণিজ্যিক যাত্রীসেবা চালুর বিষয়টি পৃথকভাবে বিবেচনা করতে হবে।
উড়ন্ত ট্যাক্সি চালু হলে নির্দিষ্ট রুটে আকাশপথ ব্যবহার করে দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এর বাস্তব ব্যবহার নির্ভর করবে নিরাপত্তা অনুমোদন, অবকাঠামো, পরিচালনব্যবস্থা ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরুর ওপর।
প্রতিদিন ১ কোটি ১০ লাখের বেশি সড়কযাত্রা
দুবাইয়ের পরিবহনব্যবস্থার ওপর চাপ কতটা বাড়ছে, তা বোঝা যায় দৈনিক যাত্রার পরিসংখ্যান থেকে। মাত্তার আল তায়েরের বক্তব্য অনুযায়ী, শহরটির সড়কে প্রতিদিন ১ কোটি ১০ লাখের বেশি যাত্রা সম্পন্ন হয়। প্রতি মিনিটে গড়ে প্রায় সাত হাজার যাত্রার সমান এটি।
এ ছাড়া প্রতিদিন ছয় মিলিয়নের বেশি মানুষ দুবাইয়ের বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত করেন। ২০৪০ সালের মধ্যে এ সংখ্যা দ্বিগুণ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এই ক্রমবর্ধমান চাহিদা সামাল দিতে নতুন পরিবহন প্রকল্পের পাশাপাশি বিদ্যমান সড়ক, মেট্রো ও অন্যান্য গণপরিবহনের কার্যকারিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
পরিবহন ব্যবস্থাপনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
দুবাইয়ের পরিবহন নেটওয়ার্ক পরিচালনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। আরটিএ ১০০টি এআইভিত্তিক পণ্য ও প্রযুক্তিগত সমাধান তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে।
এসব প্রযুক্তি পরিবহন চাহিদা অনুমান, যানজট বিশ্লেষণ, পরিচালন দক্ষতা বৃদ্ধি এবং অবকাঠামো উন্নয়নে তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করতে পারে।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, এর উদ্দেশ্য কর্মীদের প্রতিস্থাপন করা নয়; বরং তাঁদের আরও গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্য সংযোজনকারী কাজে নিয়োজিত করা।
দুই দশকের বিনিয়োগে গড়ে উঠেছে বর্তমান অবকাঠামো
দুবাইয়ের বর্তমান পরিবহন উন্নয়নের ভিত্তি তৈরি হয়েছে দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে। মেট্রো, মহাসড়ক, সেতু, টানেল ও সমন্বিত গণপরিবহনব্যবস্থায় বিনিয়োগের মাধ্যমে শহরটি তার যোগাযোগ নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ করেছে।
আরটিএর তথ্য অনুযায়ী, গত দুই দশকে সংস্থাটির প্রকল্পগুলো দুবাইয়ের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) ১৫৬ বিলিয়ন দিরহাম অবদান রেখেছে। পাশাপাশি সময় ও জ্বালানি সাশ্রয়সহ বিভিন্ন অর্থনৈতিক সুবিধার পরিমাণ ৩১৯ বিলিয়ন দিরহামের বেশি বলে জানানো হয়েছে।
ভবিষ্যতের লক্ষ্য যানজট কমানো ও যাতায়াত সহজ করা
দুবাইয়ের পরিকল্পিত ত্রিমাত্রিক পরিবহনব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হলো শহরের ক্রমবর্ধমান যাতায়াত চাহিদা সামাল দেওয়া, সড়কের ওপর চাপ কমানো এবং মানুষের মূল্যবান সময় সাশ্রয় করা।
ভূগর্ভে বিশেষ টানেল, ভূপৃষ্ঠে চালকবিহীন গাড়ি ও উন্নত গণপরিবহন এবং আকাশপথে উড়ন্ত ট্যাক্সির সমন্বয় ঘটাতে পারলে শহরের যাতায়াতব্যবস্থায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
তবে সমন্বিত ভূগর্ভস্থ নেটওয়ার্কের মতো কিছু উদ্যোগ এখনো গবেষণা ও পরিকল্পনার পর্যায়ে রয়েছে। ফলে দুবাইয়ের ভবিষ্যৎ পরিবহনব্যবস্থার পূর্ণ চিত্র নির্ভর করবে প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন, অর্থায়ন, নিরাপত্তা এবং নির্ধারিত সময়সীমা অর্জনের ওপর।
এস আই/














Discussion about this post