যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের উপকণ্ঠে একটি হিন্দু মন্দিরে গণহত্যার পরিকল্পনার অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া ১৯ বছর বয়সী এক তরুণের গাড়ি হামলার কয়েক ঘণ্টা আগে মন্দিরের গাড়ি রাখার স্থানে প্রবেশ করেছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ। অভিযুক্ত আলেক্সান্দ্রোস পাপোরাকিসের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী হুমকি দেওয়া এবং অবৈধভাবে রাইফেল রাখার অভিযোগ আনা হয়েছে।
ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের কর্তৃপক্ষের ধারণা, গত রোববার (১১ অক্টোবর) দুপুরে শিকাগোর পশ্চিমে অরোরা শহরে অবস্থিত শ্রী ভেঙ্কটেশ্বর স্বামী (বালাজি) মন্দিরের গাড়ি রাখার স্থানে প্রবেশ করেন পাপোরাকিস। প্রায় ১৫ মিনিটেরও কম সময় পর তার গাড়িটি সেখান থেকে চলে যায়। ওই দিনই পুলিশের কাছে হামলার পরিকল্পনার তথ্য পৌঁছালে নিজের বাড়ির কাছ থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পালাটাইন শহরের পুলিশপ্রধান উইলিয়াম নর্ড জানান, পাপোরাকিসের নামে নিবন্ধিত লাল রঙের একটি গাড়ি রোববার (১১ অক্টোবর) দুপুর ১২টা ২৫ মিনিটের দিকে মন্দিরের গাড়ি রাখার স্থানে প্রবেশ করে। ১৫ মিনিটের কম সময়ের মধ্যে সেটি বেরিয়ে যায়। পরে দুপুর ২টার দিকে বাড়ির কাছাকাছি এলাকায় গাড়ির ভেতরে তাকে একা দেখা যায়।
এর আগে, একটি খাবারের দোকানে পাপোরাকিসের সহকর্মীরা ৯১১ নম্বরে ফোন করে পুলিশকে জানান, তিনি ভারতীয়দের হত্যা করতে আর তর সইছে না বলে মন্তব্য করেছেন। পাশাপাশি, রোববারকে (১১ অক্টোবর) তিনি বিশেষ দিন বলেও উল্লেখ করেছিলেন বলে আদালতে জানিয়েছেন আইনজীবীরা।
পুলিশের দাবি, রোববার (১১ অক্টোবর) পাপোরাকিস এক সহকর্মীকে জানান, তার বন্দুক আটকে যাওয়ায় তিনি দ্রুত সেখান থেকে চলে এসেছেন। তবে আবার চেষ্টা করবেন বলেও হুমকি দেন। তিনি ওই সহকর্মীকে এআর-ধরনের একটি রাইফেলের ভিডিও এবং কৌশলগত পোশাক পরা নিজের একটি ছবিও পাঠিয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
আইনজীবীদের ভাষ্য অনুযায়ী, পাপোরাকিস আট পৃষ্ঠার একটি নথিও পাঠিয়েছিলেন। এতে অশ্বেতাঙ্গদের নিয়ে বর্ণবাদী গালিগালাজের পাশাপাশি তাদের যত বেশি সম্ভব হত্যা করার পরিকল্পনার কথা লেখা ছিল। ওই নথিতে নিজেকে শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী ও নব্য নাৎসি হিসেবেও পরিচয় দিয়েছিলেন তিনি। গণহত্যার কল্পনা করতেন বলেও নথিতে উল্লেখ ছিল বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
পালাটাইনে পাপোরাকিসের বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে নম্বরবিহীন এআর-ধরনের একটি রাইফেল, গুলিভর্তি একাধিক ম্যাগাজিন, শত শত গুলি, দক্ষিণ এশীয়দের অবমাননা করে লেখা একটি গ্যাসের পাত্র, কৌশলগত পোশাক এবং নাৎসি প্রতীকসংবলিত একটি চিহ্ন উদ্ধার করা হয়েছে বলে দাবি পুলিশের।
হামলার হুমকির পর শ্রী ভেঙ্কটেশ্বর স্বামী (বালাজি) মন্দির কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তা জোরদার করেছে। এক বিবৃতিতে তারা জানায়, মন্দিরের ভক্ত, কর্মী ও স্বেচ্ছাসেবকদের নিরাপত্তা তাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। এ কারণে অবিলম্বে অতিরিক্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং সশস্ত্র নিরাপত্তাকর্মীর উপস্থিতি বাড়ানো হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের অষ্টম কংগ্রেশনাল জেলার প্রতিনিধি রাজা কৃষ্ণমূর্তি জানান, তিনিও রোববার (১১ অক্টোবর) ওই মন্দিরে গিয়েছিলেন। তার দাবি, অভিযুক্তের রাইফেল আটকে যাওয়ায় সেদিন বড় ধরনের হত্যাকাণ্ড ঘটেনি। ঘটনার পর নিজের নিরাপত্তাব্যবস্থাও বাড়িয়েছেন তিনি।
কৃষ্ণমূর্তি এ ঘটনাকে বিদ্বেষপ্রসূত অপরাধ হিসেবে তদন্তের জন্য কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। পাশাপাশি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরাপত্তা জোরদারে কেন্দ্রীয় সরকারের অনুদান ছাড় করারও দাবি জানিয়েছেন তিনি।
অরোরা শহরের মেয়র জন ল্যাশ জানান, এলাকায় অন্য মন্দিরগুলোতে নির্ধারিত অনুষ্ঠান সম্পর্কেও পুলিশকে অবহিত করা হয়েছে। অন্য মন্দির কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
পুলিশ জানায়, পাপোরাকিসের মাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও তিনি তদন্তে সহযোগিতা করছেন না। বুধবার আদালতে হাজির করার পর বিচারক তাকে কারাগারে রাখার নির্দেশ দেন। আগামী ৩০ অক্টোবর তার পরবর্তী আদালত-শুনানির দিন ধার্য রয়েছে।
তবে পাপোরাকিসের পক্ষে থাকা কুক কাউন্টির সরকারি আইনজীবী কার্যালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, মামলাটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং তদন্তে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে। পুলিশ ও আইনজীবীদের বক্তব্যকে অভিযোগ হিসেবে বিবেচনা করার আহ্বান জানিয়ে কার্যালয়টি বলেছে, তদন্ত এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে মামলার তথ্য ও পরিস্থিতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসতে পারে।
এদিকে, এশীয়দের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক ঘটনার তথ্য সংগ্রহকারী সংস্থা স্টপ এএপিআই হেট জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে দক্ষিণ এশীয়দের বিরুদ্ধে হুমকি ও বিদ্বেষের ঘটনা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেড়েছে। সংস্থাটির সহপ্রতিষ্ঠাতা মঞ্জুশা কুলকার্নি বলেন, হামলার পরিকল্পনা নস্যাৎ হওয়ায় স্বস্তি মিললেও ভারতীয়, হিন্দু ও দক্ষিণ এশীয়দের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বাড়তে থাকা বিদ্বেষের কারণে তৈরি হওয়া ভয় দূর হয়নি।
তিনি অভিযোগ করেন, অভিবাসী ও ভিন্ন বর্ণের মানুষদের নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য বিদ্বেষ বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে। সম্প্রতি টেক্সাসের এক রিপাবলিকান রাজনীতিকের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দক্ষিণ এশীয় শিক্ষার্থীদের নিয়ে করা মন্তব্যের কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
বর্তমানে হিন্দু মন্দিরটিতে নয় দিনব্যাপী নবরাত্রি উৎসব পালিত হচ্ছে। কুলকার্নি বলেন, এ উৎসব হওয়া উচিত আনন্দ ও সম্প্রীতির সময়, আতঙ্ক ও বিদ্বেষের নয়।
সূত্র: এনবিসি নিউজ
এস আই/














Discussion about this post