টাঙ্গাইলে কৃষক কার্ড পাওয়া কবির হোসেনকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুমুল বিতর্ক ও বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়ে। এআই-নির্ভর ছবি ও আংশিক তথ্যের ভিত্তিতে তাকে ‘অপ্রকৃত কৃষক’ দাবি করা হলেও সরেজমিন তদন্ত, প্রশাসনের যাচাই-বাছাই ও স্থানীয়দের বক্তব্যে উঠে এসেছে ভিন্ন চিত্র। সংশ্লিষ্টদের দাবি, কবির হোসেন একজন প্রকৃত প্রান্তিক কৃষক এবং নীতিমালা অনুযায়ী তিনি কৃষক কার্ড পাওয়ার যোগ্য।
জানা যায়, মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) টাঙ্গাইল শহীদ মারুফ স্টেডিয়ামে আয়োজিত কৃষক কার্ড বিতরণ ও প্রি-পাইলটিং কার্যক্রমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির হাত থেকে কার্ড গ্রহণ করেন ঘারিন্দা ইউনিয়নের উত্তর তারটিয়া গ্রামের মৃত আবু সাঈদ মিয়ার ছেলে কবির হোসেনসহ ১৫ জন কৃষক। একই অনুষ্ঠানে কৃষক হিসেবে কবির হোসেন সাবলীলভাবে বক্তব্যও দেন। তবে অনুষ্ঠান শেষে হঠাৎ করেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার কিছু ছবি ভাইরাল হয়, যেখানে তাকে বিত্তশালী বা ‘অপ্রকৃত কৃষক’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
তবে বুধবার বিকাল ও বৃহস্পতিবার (১৭ এপ্রিল) সকালে সরেজমিনে গিয়ে ভিন্ন বাস্তবতা দেখা যায়। কবির হোসেন মূলত একজন প্রকৃত কৃষক। তিনি একটি সাধারণ টিনের ঘরে বসবাস করেন। বাড়ির সামনে সবজি চাষ এবং পেছনে গরু, হাঁস-মুরগি পালন করে জীবিকা নির্বাহ করেন। তার নিজের প্রায় ১৩ শতাংশ জমি রয়েছে, পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে অন্যের জমি বর্গা নিয়ে কৃষিকাজ করে আসছেন। স্থানীয়দের কাছে তিনি একজন ক্ষুদ্র কৃষক হিসেবেই পরিচিত।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. জয়নাল, কুরবান আলীসহ একাধিক কৃষক জানান, কবির নিয়মিত কৃষিকাজ করেন এবং পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কনটেন্ট তৈরি করেন। এই দুই ধরনের কার্যক্রম একসঙ্গে করায় অনেকেই বিভ্রান্ত হয়েছেন। তবে কৃষিকাজই তার মূল পেশা—এ বিষয়ে এলাকাবাসীর মধ্যে কোনো দ্বিমত নেই।
স্থানীয় বাসিন্দারা আরও বলেন, বর্তমান সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডকে প্রশ্নবিদ্ধ ও বিতর্কিত করতে একটি স্বার্থান্বেষী মহল শুরু থেকেই পরিকল্পিতভাবে অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সেই ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবেই টাঙ্গাইলের কৃষক কার্ড কার্যক্রম নিয়েও নানা ধরনের বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
এদিকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা বাড়তে থাকায় কৃষি প্রশাসন নড়েচড়ে বসে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বুধবার (১৫ এপ্রিল) কবির হোসেনের বাড়িতে সরেজমিন পরিদর্শন করেন। পরিদর্শন শেষে তারা জানান, কবির হোসেন প্রকৃতপক্ষে একজন কৃষক এবং তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ভিত্তিহীন।
একই সঙ্গে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে গঠিত পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটিও সরেজমিনে ঘটনাটি খতিয়ে দেখে। ১৫ এপ্রিল রাতে জমা দেওয়া তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ‘কৃষক স্মার্ট কার্ড নীতিমালা ২০২৫’ অনুযায়ী কবির হোসেন একজন প্রান্তিক কৃষক হিসেবে কার্ড পাওয়ার যোগ্য। জেলা প্রশাসক শরীফা হক কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিবকে লিখিতভাবে এ তথ্য জানিয়েছেন।
জানতে চাইলে কবির হোসেন বলেন, ‘আমি একজন কৃষক। বাবার রেখে যাওয়া অল্প জমি আছে, পাশাপাশি অন্যের জমিতে বর্গা চাষ করি।’
তার বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘আমার কোনো রাজনৈতিক পদ-পদবি নেই। আমাকে নিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে অনেকে মিথ্যা তথ্য ও গুজব ছড়াচ্ছে। এ কারণে আমি শারীরিক ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছি। আমি এর সঠিক বিচার চাই।’ এ সময় কথা বলতে বলতে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও কৃষক কবির হোসেনের পক্ষে কথা বলেছেন। ঘারিন্দা ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য সৈয়দ কবিরুজ্জামান ডল বলেন, কবির দীর্ঘদিন ধরে কৃষিকাজ করছেন এবং গরু পালন ও সবজি চাষের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করেন। তার বিরুদ্ধে ছড়ানো তথ্য সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন।
এ প্রসঙ্গে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আব্দুর রহিম বলেন, প্রকৃত বিষয়টি উদঘাটনের জন্য আমরা সরেজমিনে পরিদর্শন করেছি এবং সেখানে কবির হোসেনকে একজন প্রকৃত কৃষক হিসেবে পেয়েছি। তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সঠিক নয়; তিনি প্রান্তিক পর্যায়ের একজন কৃষক।
তিনি আরও বলেন, কৃষক কার্ড গ্রহণের আগে কবির হোসেন সুসংগঠিতভাবে বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন এবং তার কথার সঙ্গে বাস্তবতার মিল পাওয়া গেছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগে দেশের কৃষকদের সম্মানিত করতে যে প্রি-পাইলটিং কার্যক্রম শুরু হয়েছে, সেটিকে কেউ যাতে কালিমালেপন করতে না পারে, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।
এম এইচ/














Discussion about this post