বয়সের ভারে ন্যুব্জ শরীর, চেহারায় পড়েছে বার্ধক্যের ছাপ। তবু থেমে নেই জীবনসংগ্রাম। নিজের ওজন মাত্র ৪৩ কেজি হলেও এখনও অনায়াসে ১০০ কেজি ওজনের বস্তা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে বহন করেন জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলার প্রবীণ কুলি আজিজুল হক মেঘা। তার দাবি, বর্তমানে তার বয়স ৯০ বছর। এই বয়সেও চোখে ভালোই দেখেন এবং নিয়মিত কাজ করে চলেছেন।
বকশীগঞ্জ উপজেলার মিয়াপাড়া গ্রামের বাসিন্দা আজিজুল হক মেঘার পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, তার বাবাও ছিলেন একজন কুলি। বাবার হাত ধরেই মাত্র ১৫ বছর বয়সে এই পেশায় যুক্ত হন তিনি। এরপর থেকে গত ৭৫ বছর ধরে বকশীগঞ্জ বাজারের বিভিন্ন দোকানে মালামাল পৌঁছে দেওয়ার কাজ করে আসছেন।
যৌবনে তিনি মাথায় করে তিন থেকে সাড়ে তিন মণ (প্রায় ১২০ থেকে ১৪০ কেজি) মালামাল বহন করতেন। বর্তমানে বয়সের কারণে শরীরের ওজন কমে ৪৩ কেজিতে নেমে এলেও মাথায় বা পিঠে তুলে দিলে এখনও প্রায় ১০০ কেজি পর্যন্ত মালামাল বহন করতে পারেন। আর নিজে তুলে নিতে পারেন ৫০ থেকে ৬০ কেজি ওজনের মালামাল।
বাজারের ব্যবসায়ীদের কাছে আজিজুল হক মেঘা একজন সৎ, বিশ্বস্ত ও পরিশ্রমী মানুষ হিসেবে পরিচিত।
দুই ছেলে ও দুই মেয়ের জনক আজিজুল হক মেঘার পরিবারে নাতি-নাতনিসহ সদস্য সংখ্যা ১৯ জন। সবাই একই বাড়িতে থাকেন এবং একই রান্নাঘরের খাবার খান।
জানা গেছে, তিনি ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ সাক্ষী। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে ভারতে প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্যে গেলেও অজ্ঞাত কারণে প্রশিক্ষণ নেওয়া হয়নি। তবে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগী হিসেবে বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেছেন।
আজিজুল হক মেঘা বলেন, “কাজ না করলে শরীর ভালো লাগে না। অসুস্থ হয়ে পড়ি। তাই সুস্থ থাকার জন্যই কাজ করি। প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা আয় হয়।”
এই বয়সেও কেন কাজ করছেন—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “কাম না করলে চলব কেমনে? কে আমার ভার নেবে? পরিবারে লোকসংখ্যা বেশি। ভরণপোষণ আর নাতিদের পড়ালেখার খরচ দিতে হয়। বাধ্য হয়েই এই বয়সে কাজ করছি। কাজ না করলে শরীরও ভালো লাগে না।”
তার বড় ছেলে সবুজ মিয়া রাজধানীর মিরপুর-১ কাঁচাবাজারে কুলির কাজ করেন। তিনি বলেন, “অভাব-অনটনের কারণেই বাবা এখনও কুলির কাজ করেন। আমিও কুলি। সামান্য বসতভিটা ছাড়া আমাদের আর কোনো সহায়-সম্পত্তি নেই।”
বকশীগঞ্জ কাঁচাবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, “আজিজুল হক মেঘা অত্যন্ত পরিশ্রমী ও সৎ মানুষ। তার সততার কারণেই ব্যবসায়ীরা তাকে ভালোবাসেন ও সম্মান করেন।”
সমিতির সাবেক সভাপতি ও কাঁচামাল ব্যবসায়ী এমাজল হক বলেন, “এই বয়সেও তিনি ১০০ কেজি মালামাল বহন করতে পারেন। তার শরীরে তেমন কোনো রোগবালাই নেই। তিনি একজন বিশ্বস্ত মানুষ।”
এস আই/














Discussion about this post