জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো ছাড়া সরকারের সামনে কোনো বিকল্প ছিল না বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। একই সঙ্গে দাম বাড়ানোর কারণে জনগণের যে কষ্ট হবে, তার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন তিনি।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে প্রতিমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির কারণে অব্যাহতভাবে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি পাচ্ছে। এই সংকট প্রতিদিন নতুন মাত্রায় আমাদের সামনে আবির্ভূত হচ্ছে। এর ফলে বিমার প্রিমিয়াম ও জাহাজ ভাড়া বাড়ছে। এ অবস্থায় জনগণের ভোটে নির্বাচিত বর্তমান সরকারের পক্ষে এ মুহূর্তে জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় করা ছাড়া কোনো বিকল্প ছিল না।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, আমরা বারবারই বলেছিলাম যে উপায়হীন না হলে এই অজনপ্রিয় সিদ্ধান্তটি সরকার নিতে চাইবে না কিংবা নেবে না।
অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, এরকম একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া অত্যন্ত কঠিন। জনগণের জীবনমানের কষ্ট লাঘবের অভিপ্রায়ে রাজনীতিতে এসেছি। একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে জনগণের যে কষ্ট হবে, এটি আমি উপলব্ধি করি। সেই কারণে জনগণের কাছে আন্তরিকভাবে আমি দুঃখ প্রকাশ করছি।
তিনি বলেন, সরকার উপায়হীন না হলে এমন অজনপ্রিয় সিদ্ধান্ত নিতে চাইতো না। তবে চলমান সংকট দ্রুত কেটে যাবে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে জ্বালানি তেলের দাম আবারও সমন্বয় করে আগের পর্যায়ে বা তার চেয়েও কমিয়ে আনার চেষ্টা করা হবে।
সরকার আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে। নতুন দামে ডিজেল, কেরোসিন, অকটেন ও পেট্রোলের দাম লিটারে ২০ টাকা করে বেড়েছে। মূল্যবৃদ্ধির ফলে ডিজেলের দাম ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৩৫ টাকা, অকটেন ১৬০ টাকা এবং পেট্রোলের দাম ১৫৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন দাম সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) থেকে কার্যকর হয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী জানান, গত মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় না করতে পারায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে (বিপিসি) ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা লোকসান দিতে হয়েছে। এ সময়ে প্রতি মাসে গড়ে ৩ হাজার ৮১৩ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে।
অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, বছরে প্রায় ৭০ লাখ মেট্রিক টন জ্বালানি তেল আমদানি করতে হয়। এর মধ্যে ৪৫ লাখ মেট্রিক টন ডিজেল। আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেলের দাম গড়ে প্রায় ২০৫ টাকা লিটার। মূল্য সমন্বয়ের আগে দেশে ডিজেলের দাম ছিল ১১৫ টাকা। ফলে প্রতি লিটারে প্রায় ৯০ টাকা ভর্তুকি বা লোকসান দিতে হচ্ছিল। মূল্য সমন্বয়ের পরও বিপিসিকে গড়ে প্রতি লিটারে প্রায় ৭০ টাকা ভর্তুকি দিতে হবে।
তিনি বলেন, যদি আমরা এই মূল্যটি সমন্বয় না করতাম, তাহলে এক বছরেই ডিজেলে সরকারকে লোকসান দিতে হতো কিংবা ভর্তুকি দিতে হতো প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। সব জ্বালানি তেল মিলিয়ে সেটা দাঁড়াত প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, শুধু জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রে এই ভর্তুকি অব্যাহত রাখতে গেলে সরকারের চলমান সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রম ভীষণভাবে বিঘ্নিত হবে। প্রতিবন্ধী সন্তানের মা সরকারি ভাতার ওপর নির্ভর করে সন্তানকে মানুষ করেন। বিধবা নারী বিধবা ভাতার ওপর নির্ভর করে সংসার পরিচালনা করেন। অতিরিক্ত জ্বালানি ভর্তুকির কারণে এসব কর্মসূচিও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
অসচ্ছল পরিবারগুলোকে পারিবারিক কার্ডের আওতায় আনার পরিকল্পনার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, প্রতি মাসে আড়াই হাজার টাকা করে পারিবারিক কার্ডের মাধ্যমে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে মানুষের জীবনের অনিশ্চয়তা অনেকটা কমবে।
তিনি বলেন, সরকারি হাসপাতালগুলোতে সাধারণ রোগীদের বিনামূল্যে ওষুধ সরবরাহ, ইপিআই কার্যক্রমসহ সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচি জ্বালানি তেলে অতিরিক্ত ভর্তুকি দিতে গিয়ে বিঘ্নিত হতে পারে, ক্ষেত্রবিশেষে স্থবির হয়ে যেতে পারে। কোনো বিকল্প না থাকায় সরকারকে মূল্য সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।
বাংলাদেশে তেলের দাম কম
প্রতিমন্ত্রী বলেন, পার্শ্ববর্তী ও এ অঞ্চলের দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম সর্বনিম্ন পর্যায়ে ছিল।
তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কলকাতায় ডিজেলের দাম ১৩৪ টাকা ৭৬ পয়সা, মিয়ানমারে ১৬৪ টাকা ৮৩ পয়সা, নেপালে ১৬১ টাকা ২৪ পয়সা, শ্রীলঙ্কায় ১৭৯ টাকা ৪২ পয়সা, থাইল্যান্ডে ১৫১ টাকা ২২ পয়সা, ভিয়েতনামে ১৩৭ টাকা, মালদ্বীপে ১৪০ টাকা, ফিলিপাইনে ১৬৮ টাকা ৫৩ পয়সা, পাকিস্তানে ১৮৫ টাকা ৪৮ পয়সা এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১৪৪ টাকা ৭৯ পয়সা।
তিনি বলেন, ‘এই অঞ্চলে একমাত্র আমাদের এই প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশেই জ্বালানি তেলের মূল্য সর্বনিম্ন পর্যায়ে ছিল।’
পাচার ঠেকাতে দাম বৃদ্ধি
বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম কম থাকায় প্রবাসীদের কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রায় কেনা জ্বালানি তেল প্রতিবেশি রাষ্ট্রগুলোতে পাচারের বড় ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।
তিনি বলেন, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি অব্যাহত রাখা এবং জ্বালানি তেল পাচার ঠেকাতেই সরকারকে মূল্য সমন্বয় করতে হয়েছে।
প্রতিবেশী দেশে জ্বালানি তেল পাচারের কোনো তথ্য আছে কি না জানতে চাইলে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিভিন্ন দায়িত্বশীল সূত্র থেকে তারা এ ধরনের ঝুঁকি অনুভব করেছেন। এসব সূত্রের ওপর ভিত্তি করেই সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।
তিনি বলেন, কলকাতায় ডিজেলের দাম ১৩৪ টাকা ৭৬ পয়সা হলেও বাংলাদেশে ডিজেলে এখনও প্রতি লিটারে প্রায় ৭০ টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে মূল্য সমন্বয়ের চেষ্টা করা হয়েছে, যেন পাচার ঠেকানো যায়।
মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়া অনুসরণ
আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে দেশে বাড়বে, কমলে কমবে এমন স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি কেন পুরোপুরি কার্যকর করা হয়নি জানতে চাইলে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সেটি পুরোপুরি কার্যকর রাখতে হলে ডিজেলের দাম ২০৫ টাকা লিটার নির্ধারণ করতে হতো।
‘বাংলাদেশের খেটে খাওয়া মানুষ, এই কৃষক যারা সেচের জন্য ডিজেলের ওপর নির্ভরশীল, গণপরিবহন ব্যবস্থা—আপনি কি মনে করেন ২০৫ টাকার ডিজেল তারা এফোর্ড করে?’ বলেন তিনি।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ১৬ বছরে জ্বালানি তেলের দাম ৭২ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছিল উল্লেখ করে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেন, বর্তমান সরকার ছয় মাসে ৩৫ থেকে ৩৭ শতাংশ দাম বাড়িয়েছে। বিরোধী দলে থাকার সময় বর্তমান সরকারও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর সমালোচনা করেছিল। তাহলে পার্থক্য কোথায়?
জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বর্তমান মধ্যপ্রাচ্য সংকটের বাস্তবতা অতীতের পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনীয় নয়।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ যেসব জায়গা থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করে, তার বড় একটি অংশ হরমুজ প্রণালীর প্রান্তিক অঞ্চল থেকে আসে। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই রুট দিয়ে পরিচালিত হয় এবং বাংলাদেশের আমদানিকৃত জ্বালানির প্রায় ৭০ শতাংশ সেখান থেকে আসে।
তার ভাষ্য, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংকট যে অচিন্তনীয় সমস্যা ও প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে, তার সঙ্গে কোভিড-১৯ কিংবা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধেরও তুলনা করা যায় না। তাই অতীত ও বর্তমানের বাস্তবতা ভিন্ন।
বিপিসির তহবিল নিয়ে ব্যাখ্যা
বিপিসির তহবিলে বিপুল অর্থ থাকার পরও লোকসানের কথা বলে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হচ্ছে কেন জানতে চাইলে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিপিসির কোষাগারে অর্থ ছিল বলেই এতদিন মূল্য সমন্বয় না করেও ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা লোকসান বহন করা সম্ভব হয়েছে।
আইএমএফের অডিটের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের সময়ে এই ঋণ নেওয়া হয়নি। আগের সরকার আইএমএফের কাছ থেকে ঋণ নেওয়ার সময় যে শর্ত নিয়েছিল, সেই শর্ত প্রতিপালনে যদি কোনো দায় থাকে, তা পূরণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমার খবরের মধ্যেই বাংলাদেশে দাম বাড়ানো হলো কেন জানতে চাইলে প্রতিমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি মুহূর্তে দাম বাড়ে ও কমে। প্রতিটি ওঠানামার সঙ্গে সঙ্গে দেশের বাজারে দাম সমন্বয় করা সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংকট অচিরেই কেটে যাবে বলে তারা আশা করছেন। কারণ এই সংকট কারও জন্যই ভালো কিছু বয়ে আনছে না।
‘জ্বালানির বাজার স্বাভাবিক হয়ে আসলে আমরা দ্রুততম সময়ের মধ্যেই চাইব মূল্য আবারও সমন্বয় করে পূর্বের জায়গায় কিংবা তার থেকেও আরও কম মূল্যে নির্ধারণ করতে’—বলেন প্রতিমন্ত্রী।
এ ইউ/














Discussion about this post