ঋণ করে সংসারের সচ্ছলতা ফেরাতে সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নজরুল ইসলাম মাহিন। কিন্তু পরিবারের স্বপ্ন পূরণের আগেই শেষ হলো তার জীবন। মক্কায় তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনায় এসেছে গ্রেপ্তারের আগে লেখা তার ফেসবুক পোস্টগুলো।
‘চিন্তা কমাতেও চিন্তা করতে হয় মধ্যবিত্ত সন্তানদের’২০২৩ সালের ৩ মে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে এমন আক্ষেপের কথা লিখেছিলেন নজরুল ইসলাম মাহিন। পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতির আশায় সাত লাখ টাকা ঋণ করে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন তিনি। তবে প্রবাসে গিয়ে আর পরিবারের দুশ্চিন্তা দূর করা হয়নি তার।
পরিবারের সদস্যদের দাবি, তিন বছর তিন মাস কারাগারে থাকার পর বুধবার (১৪ অক্টোবর) সৌদি আরবের মক্কায় নজরুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। এ খবর জানাজানি হওয়ার পর তার পুরোনো ফেসবুক পোস্টগুলো ঘিরে শোক প্রকাশ করছেন অনেকে।
নজরুলের ফেসবুক প্রোফাইল ঘুরে দেখা যায়, প্রবাসজীবনের শুরু থেকেই মধ্যবিত্ত পরিবারের নানা সংকট, স্বপ্ন ও বাস্তবতা নিয়ে লিখতেন তিনি।
২০২২ সালের ১৩ নভেম্বর দেশ ছাড়ার সময় বিমানবন্দরে দাঁড়িয়ে তোলা একটি ছবি পোস্ট করে নজরুল লিখেছিলেন, ‘গুড বাই বাংলাদেশ। সবাই অনেক মনে পড়ছে, সবাই আমার জন্য দোয়া করবেন।’
সৌদি আরবে যাওয়ার পর একই বছরের ২৯ নভেম্বর আরেকটি পোস্টে তিনি লেখেন, ‘ভাব নেয়াটা আমাকে মানায় নাহ, কারণ আমি মধ্যবিত্ত।’
এরপর ২০২৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি ঘাসের ওপর শুয়ে থাকা একটি ছবি প্রকাশ করে তিনি লেখেন, ‘পকেটে টাকা থাকলে তোমরা দুনিয়া কিনতে পারবে।’
একই বছরের ৩ মে মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানদের দুশ্চিন্তা নিয়ে আক্ষেপ প্রকাশ করেন নজরুল। তার সেই লেখাটি এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
পরবর্তী সময়ে মক্কার পবিত্র মসজিদুল হারামে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ পান নজরুল। ২০২৩ সালের ৮ মার্চ কাবা শরিফের সামনে নীল রঙের ইউনিফর্ম পরা নিজের একটি ছবি পোস্ট করে সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি।
ছবিটির ক্যাপশনে লিখেছিলেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ ক্লিনার মক্কা হেরাম শরিফ।’
নজরুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর প্রকাশের পর তার ওই পোস্টেও শোক ও সমবেদনা জানাচ্ছেন অনেকে।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের নভেম্বরে সৌদি আরবে যাওয়ার প্রায় ছয় মাস পর মক্কার একটি মসজিদে এক তরুণীর সঙ্গে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে নজরুলসহ দুজনকে গ্রেপ্তার করে দেশটির পুলিশ।
এরপর থেকে কারাগারেই ছিলেন তিনি। পরিবারের দাবি, কারাগারে থাকা অবস্থায় প্রতি রোববার স্বজনদের সঙ্গে কথা বলতেন নজরুল। তবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে পরিবারকে কিছু জানানো হয়নি। গণমাধ্যম ও ফেসবুকে প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ছেলের মৃত্যুর বিষয়টি জানতে পারেন তারা।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার বিরামপুর গ্রামের বাসিন্দা নজরুল চার ভাই-বোনের মধ্যে সবার বড় ছিলেন। তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর শুনে ওই দিন রাতেই হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তার ফুফু আবেদা বেগম।
নজরুলের মা রহিমা বেগম বলেন, কারাগারে থাকার সময় ছেলে নিয়মিত পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতেন। কিন্তু হঠাৎ করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর পেয়ে তারা ভেঙে পড়েছেন।
নজরুলের বাবা আব্দুল বাছিরের আক্ষেপ, সাত লাখ টাকা ঋণ করে সংসারের হাল ধরতে ছেলেকে সৌদি আরবে পাঠিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু যাওয়ার ছয় মাসের মাথায় কারাগারে চলে যেতে হয় নজরুলকে। এর মধ্যে পরিবারকে মাত্র দেড় লাখ টাকা পাঠাতে পেরেছিলেন তিনি।
ছেলের মৃত্যুর পর একদিকে ঋণদাতাদের চাপ, অন্যদিকে সন্তান হারানোর শোক—দুই সংকটে পড়েছেন পরিবারটি। নজরুল কী কারণে কারাগারে ছিলেন, সে বিষয়েও বিস্তারিত জানতেন না বলে দাবি করেছেন তার বাবা। এখন অন্তত ছেলের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা চান তিনি।
নজরুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় তিন বছরের বেশি সময় ধরে কারাগারে থাকা অবস্থায় বাংলাদেশ দূতাবাসের ভূমিকা এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও সামাজিক সংগঠকেরা।
তাদের দাবি, দ্রুত সরকারি উদ্যোগে নজরুলের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি অসহায় পরিবারটির পাশে দাঁড়ানো প্রয়োজন।
হিউম্যান রাইটস ডিফেন্ডার্স সোসাইটির (এইচআরডিএস) ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মো. সুজন সরকার বলেন, প্রবাসে কাজ করতে গিয়ে কোনো রেমিট্যান্সযোদ্ধার এমন পরিণতি অত্যন্ত দুঃখজনক। বাংলাদেশ দূতাবাসের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হলে হয়তো এমন পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব হতো বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সামাজিক সংগঠক শামীম আহমেদ বলেন, তিন বছরের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের দুজন নাগরিক সৌদি আরবে কারাগারে ছিলেন। দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া শেষে তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ দূতাবাসের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
শামীম আহমেদ আরও বলেন, সৌদি আরবে নারী কর্মীদের যৌন হয়রানি ও অমানবিক নির্যাতনের অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে এসেছে। এসব ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
এ বিষয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক মো. আবু সাঈদ বলেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। পরিবারের পক্ষ থেকেও কোনো আবেদন করা হয়নি। মরদেহ দেশে এলে নিয়ম অনুযায়ী সহায়তা করা হবে।
নজরুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবরের পর তার পরিবারের সদস্যরা এখন ছেলের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার অপেক্ষায় রয়েছেন। ঋণের বোঝা ও স্বজন হারানোর শোকের মধ্যে তাদের দাবি, দ্রুত সরকারি উদ্যোগে মরদেহ ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হোক।
এস আই/














Discussion about this post