ফিলিস্তিনের গাজা সিটিতে ইসরায়েলি হামলায় আল-জাজিরার পরিচিত সাংবাদিক আনাস আল-শরীফ ও তার চার সহকর্মী নিহত হয়েছেন। গতকাল রোববার (১০ আগস্ট) সন্ধ্যায় গাজা সিটির আল-শিফা হাসপাতালের প্রধান ফটকের বাইরে সাংবাদিকদের থাকার জন্য বানানো একটি তাঁবুতে এই হামলার ঘটনা ঘটে। হামলায় মোট সাতজন নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। নিহতরা হলেন আল জাজিরা আরবির পরিচিত সংবাদদাতা আল-শরীফ (২৮), সংবাদদাতা মোহাম্মদ কুরেইকেহ এবং ক্যামেরা অপারেটর ইব্রাহিম জাহের ও মোহাম্মদ নওফাল ও মোমেন আলিওয়া।
২৮ বছর বয়সী আনাস আল-শরীফ গাজার উত্তরাঞ্চল থেকে ইসরায়েলি হামলা নিয়ে নিয়মিত খবর পরিবেশন করতেন। নিহত হওয়ার কিছুক্ষণ আগে তিনি এক্স (সাবেক টুইটার)-এ লিখেছিলেন, গাজা সিটির পূর্ব ও দক্ষিণ অংশে ইসরায়েল ‘ফায়ার বেল্ট’ নামে পরিচিত তীব্র ও লক্ষ্যকেন্দ্রিক বোমাবর্ষণ শুরু করেছে।
মৃত্যুর পর প্রকাশের জন্য শরীফ একটি ‘শেষ বার্তা’ লিখে রেখেছিলেন। সেই বার্তায় তিনি লিখেছিলেন, তিনি সত্যকে বিন্দুমাত্র বিকৃতি ছাড়াই তুলে ধরতে কখনো দ্বিধা করেননি। তিনি আরও লেখেন, ‘আমাদের শিশু ও নারীদের ক্ষতবিক্ষত দেহও তাঁদের হৃদয়কে নড়াতে পারেনি, কিংবা দেড় বছরের বেশি সময় ধরে আমাদের জনগণের ওপর চলা হত্যাযজ্ঞ থামাতে পারেনি।’ নিজের স্ত্রী ও সন্তানদের রেখে চলে যাওয়ার আশঙ্কার কথাও তিনি প্রকাশ করেছিলেন।
আল-শরীফের পরিবারে তার মা, স্ত্রী ও দুই সন্তান আছেন। নিজের মৃত্যুর পর সন্তানদের, বিশেষ করে কন্যা ও ছেলের যত্ন নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি লেখেন, “তাদের পাশে থাকুন, আল্লাহর পর আপনি-ই হোন তাদের ভরসা। আমি যদি মৃত্যুবরণ করি, তবে নিজের নীতিতে অটল থেকেই করব।”
বার্তায় তিনি বিশ্ববাসীকে আহ্বান জানান, ফিলিস্তিন ও এর জনগণের পাশে থাকার জন্য, বিশেষ করে নিরপরাধ শিশুদের জন্য। নীরব না থাকার অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, সবাই যেন ফিলিস্তিনের মুক্তির সেতুবন্ধন হয়ে ওঠেন।
তিনি লিখেছেন, “আমি তোমাদের হাতে অর্পণ করছি ফিলিস্তিনকে— এটা মুসলিম বিশ্বের মুকুটমণি, বিশ্বের প্রতিটি স্বাধীন মানুষের হৃদস্পন্দন। আমি তোমাদের হাতে অর্পণ করছি এর জনগণকে, নিরপরাধ সেই শিশুদের, যারা কখনো স্বপ্ন দেখার বা নিরাপদে বেঁচে থাকার সুযোগ পায়নি।”
তিনি আরও বলেন, “শিকল যেন তোমাদের নীরব না করে, সীমান্ত যেন আটকে না রাখে। ভূমি ও মানুষের মুক্তির পথে সেতু হয়ে ওঠো, যতক্ষণ না আমাদের চুরি যাওয়া মাতৃভূমিতে মর্যাদা ও স্বাধীনতার সূর্য উদিত হয়।”
নিজের এই উইলে তিনি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন, যেন তাকে শহীদ হিসেবে কবুল করা হয় এবং গুনাহসমূহ ক্ষমা করা হয়। শেষ লাইনে তিনি লিখেন, “গাজাকে ভুলে যেও না… আর তোমাদের আন্তরিক দোয়ার মধ্যে আমাকে ভুলে যেও না।”
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী শরীফকে ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যার কথা নিশ্চিত করে দাবি করেছে যে তিনি হামাসের একটি সেলের প্রধান ছিলেন। তবে মানবাধিকার সংস্থা ইউরো-মেড হিউম্যান রাইটস মনিটরের বিশ্লেষক মুহাম্মদ শেহাদা এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, শরীফের সহিংস কার্যকলাপে জড়িত থাকার কোনো প্রমাণ নেই। তার ভাষায়, “সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে কাজ করাই ছিল তাঁর প্রতিদিনের রুটিন।”
এই হামলার ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়ে আল জাজিরা এক বিবৃতিতে বলেছে, এটি সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর আরেকটি নগ্ন ও পূর্বপরিকল্পিত হামলা। গাজায় চলমান গণহত্যা বন্ধ করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি সিদ্ধান্তমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে আল-জাজিরা।
এম এইচ/














Discussion about this post