বিদেশি ওয়েবসাইট থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে দেশে সরকারি সেবা নিতে কোথায় কত টাকা ঘুষ চাওয়া হচ্ছে, সেই তথ্য জানাতে দুই বন্ধু মিলে তেরি করেছেন ‘ঘুষ.সাইট’ (ghush.site)। গত শুক্রবার (২১ আগস্ট) ওয়েবসাইটটি চালু হওয়ার পর মাত্র ৩ দিনেই এটিতে সরকারি সেবা পেতে ঘুষ চাওয়ার ১ হাজার ৩২৯ টি অভিযোগ জমা পড়েছে। আর ঘুষ হিসেবে চাওয়া অর্থের পরিমাণ ২৫ কোটি ৫৫ লাখ টাকা।
গত ২১ আগস্ট চালু হওয়া ওয়েবসাইটটিতে কোনো অ্যাকাউন্ট খোলা বা ব্যক্তিগত পরিচয় দেওয়ার প্রয়োজন নেই। সরকারি সেবা নিতে গিয়ে ঘুষ চাওয়ার অভিজ্ঞতা যে কেউ বেনামে জানাতে পারেন।
উদ্যোক্তাদের দাবি, এর মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরকারি সেবা ও দপ্তরকেন্দ্রিক ঘুষ চাওয়ার ধরন ও পরিমাণের একটি সামগ্রিক চিত্র তৈরি হচ্ছে।
ওয়েবসাইটে অভিযোগ জানাতে ব্যবহারকারীকে সংশ্লিষ্ট দপ্তর, সেবার ধরন, আনুমানিক এলাকা, ঘুষ হিসেবে দাবি করা অর্থের পরিমাণ এবং শেষ পর্যন্ত কী ঘটেছে—এসব তথ্য দিতে হয়। চাইলে ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণও দেওয়া যায়। মাত্র দুই মিনিটেরও কম সময়ে পুরো প্রক্রিয়াটি শেষ করা সম্ভব। তবে কোনো ব্যক্তির নাম, পদবি বা ফোন নম্বর উল্লেখ করার সুযোগ রাখা হয়নি।
ওয়েবসাইটে প্রকাশিত অভিযোগগুলোর মধ্যে সরকারি জমি অধিগ্রহণের অর্থ ছাড়, পাসপোর্ট ভেরিফিকেশন এবং গাড়ির ফিটনেসসহ বিভিন্ন সরকারি সেবা নিয়ে ঘুষ দাবির অভিযোগ রয়েছে। চাঁদপুরে জমি অধিগ্রহণের টাকা উত্তোলনের ক্ষেত্রে ঘুষ চাওয়ার অভিযোগ করেছেন একজন।
অভিযোগে তিনি লিখেছেন, ‘আমাদের জমি সরকার একয়ার (অধিগ্রহণ) করেছে। সেই জমির টাকা উত্তোলন করতে আমাকে ঘুষ দিতে হয়েছে। ঘুষ না দিলে এই কাগজ নেই, ওইটা নেই, ওইখানে যান; এটা-ওটা করেন, আজকে স্যার আসেনি। আমার বাবা ৪ বছর ধরে ঘুরছে এখন পর্যন্ত আমাদের টাকা উঠাতে পারেনি।’
ধামরাইয়ে পাসপোর্ট ভেরিফিকেশনের জন্য ১ হাজার ৫০০ টাকা দাবির অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে অভিযোগকারী লিখেন, ‘ধামরাই থানায় এসবির এসআই পাসপোর্ট ভেরিফিকেশনের জন্য যাওয়ার পর আমার কাছে ১৫০০ টাকা দাবি করা হয়। আমি ছাত্র আমার কাছে টাকা নেই বললে খারাপ ব্যবহার শুরু করে। পরে আমি ৫০০ টাকা দিতে রাজি হই; কিন্তু সে ছাড়বে না বলে আমাকে থানা থেকে বের করে দেয়।’
আবার মৌলভীবাজারে বিআরটিএ কার্যালয়ে গাড়ির ফিটনেস করাতে অতিরিক্ত ১ হাজার ৫০০ টাকা নেওয়ার অভিযোগও জমা পড়েছে। ওই অভিযোগকারী দাবি করে বলেন, ‘আমি আমার গাড়ির ফিটনেস করানোর জন্য বিআরটিএ কার্যালয়ে যাই। গাড়ির প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও ফিটনেস সংক্রান্ত বিষয়গুলো ঠিক থাকার পরও আমার কাছে অতিরিক্ত ১ হাজার ৫০০ টাকা দাবি করা হয়, পরে আমি সে টাকা পরিশোধ করি।’
পেনশন স্কিম অনলাইনে আপডেট করতে গেলে ঢাকার একজন বাসিন্দার কাছে ঘুষ চাওয়া হয়। পরে কাজ করতে ঘুষ দিতে বাধ্য হন বলে জানান ওই ভুক্তভোগী। তিনি বলেন, ‘পেনশনের ফাইল অনলাইনে আপডেট করার জন্য ঢাকা জিপিওতে আবেদন ফর্ম জমা দেওয়ার সময় পেনশন বিভাগ থেকে জানানো হয় ২ হাজার টাকা দিলে এক সপ্তাহের মধ্যে অনলাইনে আপডেট করে দেবে। তা না হলে ২ মাস সময় অপেক্ষা করতে হবে। প্রথমে টাকা না দিয়ে ২ মাসের বেশি অপেক্ষা করেও যখন কাজ হয়নি, পরে ২ হাজার টাকা দিলে সপ্তাহ খানেকের মধ্যে কাজ করে দেয়।’
রাজউকের এক কর্মচারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন এক ব্যবহারকারী। তিনি বলেন, ‘সবুজ নামের একটি ছেলে, রাজউকে মাস্টাররুলে তৃতীয় শ্রেণির চাকরি করে। মাত্র ৩৪ বছর বয়সে কোটি কোটি টাকার মালিক বনে গেসে। প্রসাশনের চোখ ফাঁকি দিয়ে।’
উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, অভিযোগগুলো জমা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয় না। প্রথমে মডারেশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জমাগুলো পর্যালোচনা করা হয়। কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত তথ্য থাকলে তা বাদ দেওয়া হয়। একইসঙ্গে আক্রমণাত্মক, অস্পষ্ট বা ওয়েবসাইটের নীতিমালা লঙ্ঘন করে—এমন অভিযোগও প্রকাশ করা হয় না। পর্যালোচনা শেষে অনুমোদিত অভিযোগগুলো বিভাগ, দপ্তর, সেবার ধরন, চাওয়া অর্থের পরিমাণ ও ঘটনার ফলাফল অনুযায়ী প্রকাশ করা হয়।
তবে ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্যকে যাচাই করা অভিযোগ বা প্রমাণ হিসেবে দাবি করছে না ‘ঘুষ.সাইট’। উদ্যোক্তাদের মূল লক্ষ্য হলো বিভিন্ন মানুষের বিচ্ছিন্ন ঘুষের অভিজ্ঞতা এক জায়গায় এনে কোন সরকারি সেবা বা দপ্তর ঘিরে কত টাকা ঘুষ চাওয়ার অভিযোগ রয়েছে, তার একটি সামষ্টিক চিত্র তুলে ধরা।
ওয়েবসাইটটির দুই প্রতিষ্ঠাতা সাইফ কবির ও শাহেদ শরিফ। বিদেশের একটি ওয়েবসাইট থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে দুই বন্ধু মিলে বাংলাদেশের জন্য ‘ঘুষ.সাইট’ তৈরি করেছেন। তাদের মতে, কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে শনাক্ত করা নয়, বরং সরকারি দপ্তর ও সেবাকেন্দ্রিক ঘুষ দাবির প্রবণতা দৃশ্যমান করাই উদ্যোগটির মূল উদ্দেশ্য।
সাইটের তথ্যে দেখা যায়, অভিযোগের সংখ্যায় ঢাকা বিভাগ সবচেয়ে এগিয়ে। তিন দিনে ঢাকায় ৮৫০টি অভিযোগ জমা পড়েছে। এরপর চট্টগ্রামে ৪৩৩টি, রাজশাহীতে ১২০টি, খুলনায় ১১৪টি, রংপুরে ৯৬টি, সিলেটে ৭৯টি, বরিশালে ৭১টি এবং ময়মনসিংহে ৬৩টি অভিযোগ রয়েছে। বিভাগভিত্তিক অভিযোগের পাশাপাশি এসব ঘটনায় চাওয়া অর্থের পরিমাণও ওয়েবসাইটে আলাদাভাবে দেখানো হচ্ছে।
উদ্যোক্তাদের দাবি, ‘ঘুষ.সাইট’ বর্তমানে তাদের নিজস্ব অর্থায়নে পরিচালিত হচ্ছে। কোনো এনজিও বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সাইটটির আনুষ্ঠানিক সম্পৃক্ততা নেই এবং বাইরের কোনো অর্থায়নও নেওয়া হয়নি। সাইটে স্বেচ্ছা অনুদানের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
তারা বলছেন, সরকারি সেবা নিতে গিয়ে ঘুষ দাবির অভিজ্ঞতা যাদের হয়েছে, তাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য এক জায়গায় জমা হলে সময়ের সঙ্গে ঘুষ দাবির ধরন, কোন সেবা বা দপ্তরে অভিযোগ বেশি এবং কত অর্থ দাবি করা হচ্ছে—এসব বিষয়ে একটি বড় তথ্যভাণ্ডার তৈরি হতে পারে।
এ ইউ/














Discussion about this post