ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরের রামাল্লা শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত কোবার গ্রাম এই মুহূর্তে উদযাপনের পরিকল্পনা নিয়ে ব্যস্ত। দীর্ঘদিন ধরে বন্দি মারওয়ান বারঘৌতির মুক্তির ব্যাপারে আশাবাদী গ্রামবাসী, তিনি ফিরলে কীভাবে উদযাপন করা হবে-সেই চিন্তায় বিভোর। ফিলিস্তিনিদের ঐক্যবদ্ধ করায় তার ভূমিকার জন্য পরিচিত বারঘৌতি। তাকে ফিলিস্তিনি ‘নেলসন ম্যান্ডেলা’ও বলা হয়।
তার চাচাতো ভাই মোহাম্মদ আল-বারঘৌতি আমাকে জানান, তিনি ‘৮০ শতাংশ নিশ্চিত’ যে মারওয়ান বারঘৌতিকে শিগগিরই মুক্তি দেওয়া হবে। আমাদের আশেপাশে দাঁড়িয়ে থাকা যুবকরাও এই বিষয়ে একমত।
গাজা শান্তি নিয়ে চলমান শান্তি প্রচেষ্টা এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বিবৃতির দ্বৈত প্রভাবেই এই আশাব্যঞ্জক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন বারঘৌতির পরিবার এবং কোবার গ্রামের বাসিন্দারা।
গত সপ্তাহে টাইম ম্যাগাজিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, ইসরায়েলকে তিনি মারওয়ান বারঘৌতিকে মুক্তি দেওয়ার বিষয়ে বলতে পারেন, যাতে তিনি (বারঘৌতি) গাজায় প্রশাসনিক নেতৃত্ব দিতে পারেন।
এই প্রসঙ্গে মনে রাখা দরকার, ইসরায়েলি জিম্মিদের মুক্তির বদলে (ইসরায়েলের কাছে) হামাস যে ২০ জন বন্দির মুক্তি দাবি করেছে, সেই তালিকায় মারওয়ান বারঘৌতিও রয়েছেন। যদিও ইসরায়েলের এতে সম্মতি ছিল না।
জনমত জরিপ বলছে, ৬৬ বছর বয়সী মারওয়ান বারঘৌতি সবচেয়ে জনপ্রিয় ফিলিস্তিনি রাজনীতিবিদ। যে সময় রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের সূচনা হয়েছিল, তখন তার বয়স মাত্র ১৫ বছর।
ফিলিস্তিনি নেতা ইয়াসির আরাফাতের নেতৃত্বাধীন ফাতাহ আন্দোলনের মাধ্যমে তার রাজনৈতিক জীবন শুরু করেছিলেন মারওয়ান বারঘৌতি।
পরবর্তীকালে তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ‘ফিলিস্তিনিদের স্বার্থ এবং দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের’ জন্য নিজের সমর্থনকে অব্যাহত রেখেছিলেন।
ইসরায়েলের ‘অপারেশন ডিফেন্স শিল্ড’ চলাকালীন তাকে ২০০২ সালে গ্রেফতার করা হয়েছিল। তার বিরুদ্ধে আল-আকসা শহীদ ব্রিগেড তৈরির অভিযোগ তুলেছিল ইসরায়েল, যদিও সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বারঘৌতি।
প্রসঙ্গত, ২০০৭ সাল থেকে ফাতাহ আন্দোলনের সঙ্গে কিন্তু আল-আকসা ব্রিগেডের কোনো যোগ নেই। দ্বিতীয় ইন্তিফাদার সময়, আল-আকসা ব্রিগেড ইসরায়েলি সেনাবাহিনী এবং ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে অভিযান শুরু করে।
মারওয়ান বারঘৌতির বিরুদ্ধে ইসরায়েলের অভ্যন্তরে বেসামরিক লোকজনকে লক্ষ্য করে হামলা চালানোর অভিযোগও তোলা হয়েছে। এর জন্য তাকে ৪০ বছরের কারাদণ্ড এবং পাঁচটা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।
বিচার চলাকালীন, এই ফিলিস্তিনি নেতা ইসরায়েলি আদালতের কর্তৃত্ব অস্বীকার করার পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে তোলা সমস্ত অভিযোগও অস্বীকার করেছিলেন। আল-আকসা শহীদ ব্রিগেড বেশ কয়েকটা প্রাণঘাতী হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ।
মারওয়ান বারঘৌতির স্ত্রী ফাদওয়া বারঘৌতি একজন ফিলিস্তিনি আইনজীবী। বিবিসির সঙ্গে গত বছর কথোপকথনের সময় তিনি বলেছিলেন, ‘ওর (মারওয়ান বারঘৌতির) বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো এই কারণে আনা হয়নি যে, ও এই কাজগুলোর সঙ্গে যুক্ত, বরং এই জন্য তোলা হয়েছিল কারণ ও একজন ফিলিস্তিনি নেতা।’
রাজনীতিবিদরা মনে করেন, যদি শান্তি চুক্তি পৌঁছানো সম্ভব হয়, তাহলে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব গ্রহণ এবং ভবিষ্যতের রাষ্ট্রের জন্য প্রস্তুত হওয়ার ক্ষেত্রে একটা ‘বিকল্প’ হতে পারেন মারওয়ান বারঘৌতি।
দোষী সাব্যস্ত হওয়ার ঘটনা তাকে বহুল পরিচিতি দেয়। প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে তাকেই দেখা হয়।
মারওয়ান বারঘৌতি বরাবরই জানিয়ে এসেছেন তিনি ইসরায়েলের সঙ্গে শান্তি স্থাপনের পক্ষে এবং একইসঙ্গে ১৯৬৭ সালের পূর্ববর্তী সীমানার উপর ভিত্তি করে দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের সমর্থনও করেন তিনি।
ইসরায়েলিদের অনেকেই তার মুক্তির বিপক্ষে। তাদের অভিযোগ, পাঁচজনকে হত্যার সঙ্গে তিনি জড়িত ছিলেন এবং তার ‘হাতে রক্ত লেগে আছে’।
আবার অনেকে এ-ও মনে করেন যে, তার মুক্তি ফিলিস্তিনিদের মধ্যে ঐকমত্য তৈরি করা, প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলিকে একত্রিত করা এবং শান্তি আনার সর্বোত্তম সম্ভাবনা তৈরি করার একটা উপায় হতে পারে।
মারওয়ানের স্ত্রী ফাদওয়া বারঘৌতি ডোনাল্ড ট্রাম্পকে পাঠানো এক বার্তায় বলেছেন, এই অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্টের লক্ষ্য অর্জনে তার স্বামী সাহায্য করতে পারেন।
গত সপ্তাহে টাইম ম্যাগাজিনকে দেওয়া এক বিবৃতিতে ফাদওয়া বারঘৌতি বলেছেন, ‘মিস্টার প্রেসিডেন্ট, একজন সত্যিকারের অংশীদার আপনার জন্য অপেক্ষা করছেন, যিনি আমাদের অভিন্ন স্বপ্নকে বাস্তব রূপ দিতে সাহায্য করতে পারেন এবং যা এই অঞ্চলে ন্যায়সঙ্গত ও স্থায়ী শান্তি আনবে।’
‘ফিলিস্তিনি জনগণের স্বাধীনতা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শান্তির স্বার্থে মারওয়ান বারঘৌতিকে মুক্তি পেতে সাহায্য করুন।’
এস এইচ/














Discussion about this post