মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অবরোধ আর আন্তর্জাতিক নজরদারি সত্ত্বেও থেমে নেই ইরানের সামরিক তৎপরতা। আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থা ও সরবরাহের ফাঁকফোকর কাজে লাগিয়ে অস্ত্র ও বিস্ফোরক আমদানি করে যাচ্ছে ইরান। আর এই কার্যক্রম সম্পন্ন করতে ৫ হাজারের বেশি সংস্থার এক গোপন নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে দেশটি।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক চাঞ্চল্যকর অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে ইরান সরকারের এক বিশাল এবং গোপন সামরিক সরবরাহ ব্যবস্থার তথ্য। ৩০ অক্টোবর প্রকাশিত সেই প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়, ছদ্মবেশী নেটওয়ার্কের সুবিধা নিয়ে কীভাবে সুপারপাওয়ারের অবরোধ ব্যর্থ করে দিচ্ছে ইরান।
হাজার হাজার ব্যাংক হিসেব, সরকারি নথি ও ব্যবসায়িক নিবন্ধন পর্যালোচনার ওপর ভিত্তি করে রয়টার্স এই বিশ্লেষণটি তৈরি করেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরান সরকার বিশ্বজুড়ে প্রায় ৫,০০০ গোপন সংস্থা, মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান এবং ফ্রন্ট কোম্পানির একটি নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে।
এই সংস্থাগুলো এমনভাবে গঠন করা হয়েছে যে, আপাতদৃষ্টিতে এগুলোর সাথে সামরিক বাহিনী বা ইরানের সরাসরি সম্পর্কের কথা বিশ্ববাসী জানতে পারে না। ওয়েস্টার্ন ওয়াচলিস্ট বা ব্লকলিস্টে স্থান না পাওয়ায় এসব ছদ্মবেশী সংস্থা বিশ্বজুড়ে সহজে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা, লেনদেন করা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য ক্রয়ের সুযোগ পাচ্ছে।
এই গোপন নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে ইরান অন্তত ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের সামরিক সরঞ্জাম দেশে এনেছে। যার মধ্যে রয়েছে উন্নত প্রযুক্তির যন্ত্রাংশ, চিপ ও বিস্ফোরক দ্রব্যাদি। এছাড়াও রয়েছে মিসাইল বহনের জন্য ভারী ট্রাক এবং ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির জন্য ইলেকট্রনিক পণ্য।
এসব সরঞ্জাম দেশে প্রবেশ করানোর জন্য ইরান কাস্পিয়ান সাগরের রুটটি সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করছে। রাশিয়া থেকে কার্গো জাহাজের মাধ্যমে কাস্পিয়ান সাগর দিয়ে ইরানে মালামাল পৌঁছানো হচ্ছে। পাশপাশি মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন দেশ হয়ে ট্রাকে করে এবং চীন থেকে সরাসরি কার্গো বিমান ব্যবহার করে এই গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলো আনা হচ্ছে।
ইরান মূলত একের পর এক শেল কোম্পানি পরিবর্তন করে পশ্চিমাদের নজরদারি এড়িয়ে যাচ্ছে। শেল কোম্পানি হলো এমন এক ধরনের প্রতিষ্ঠান, যার কাগজে-কলমে অস্তিত্ব থাকে, কিন্তু বাস্তবে কোনো অফিস বা দৃশ্যমান ব্যবসা থাকে না। সংযুক্ত আরব আমিরাত, সাইপ্রাস, তুরস্ক বা হংকংয়ের মতো অঞ্চলগুলোতে খুব সহজেই কোনো বিস্তারিত পরিচয় প্রকাশ না করে নামমাত্র ফি দিয়ে এসব কোম্পানি খোলা যায়।
পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো যখন অনিয়মিত অর্থ লেনদেন সনাক্ত করে কোনো একটি শেল কোম্পানিকে চিহ্নিত করে, ততক্ষণে ইরান সেই কোম্পানির কাজ বন্ধ করে দেয়। একটি কোম্পানি ব্লক হতে হতে সময় লাগে কয়েক মাস। এই সময়ের মধ্যে ওই নেটওয়ার্কের অধীনে প্রস্তুত রাখা নতুন আরেকটি কোম্পানির নামে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে লেনদেন শুরু করে দেওয়া হয়।
মার্কিন প্রশাসন দাবি করে আসছে যে তারা কঠোর নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে ইরানের আর্থিক ও সামরিক কলকাঠি কেটে দিয়েছে। তবে এই অনুসন্ধানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধের একটি বড় রহস্যের জবাব মিলেছে। সেটি হলো—হাজার হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করার পরও আইআরজিসি কীভাবে তাদের অস্ত্রভাণ্ডার পুনরায় সমৃদ্ধ করছে?
এস আই/














Discussion about this post