প্রায় এক মাস ধরে একটি প্রতিবেদন নিয়ে সম্পাদকের টেবিলে বারবার ফিরে যাচ্ছিলেন সাংবাদিক সামচ্ছুদ্দিন ইলিয়াস। প্রতিবেদনের বিষয় ছিল হারিয়ে যেতে বসা নামকরণের ঐতিহ্য। জলবায়ু পরিবর্তন যে শুধু ঘরবাড়ি, জীবিকা আর পরিবেশ কেড়ে নিচ্ছে না, ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি আর পরিচয়ও বদলে দিচ্ছে, তা-ই খুঁজে এনেছিলেন তিনি। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক যে নামগুলোর ভেতর দিয়ে প্রকাশ পেত, সেই নামগুলোও হারিয়ে যাচ্ছে।
ইলিয়াসের বিশ্বাস ছিল, গল্পটি গুরুত্বপূর্ণ। সম্পাদক শুরুতে রাজি হননি। দিনের পর দিন আলোচনার পর অবশেষে সম্মতি মিলল। প্রতিবেদনটি ছাপা হলো পত্রিকার প্রধান খবর হিসেবে।
জয়টা ছোট ছিল না। কিন্তু ইলিয়াসের মনে থেকে গেল একটি অস্বস্তি। সাংবাদিকতার দীর্ঘ পথে তিনি বারবার দেখেছেন, পরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ খবরকে জায়গা পেতে লড়তে হয় রাজনীতি, সংঘাত আর দিনের আলোচিত শিরোনামের সঙ্গে। সেই অস্বস্তি থেকেই জন্ম নিল একটি প্রশ্ন: এমন একটি বার্তাকক্ষ কি হতে পারে না, যেখানে জলবায়ু, পরিবেশ আর জীববৈচিত্র্য মাঝেমধ্যের বিষয় নয়, সাংবাদিকতার কেন্দ্রবিন্দু?
সেই প্রশ্নের উত্তর আজ দ্য ক্লাইমেট ওয়াচ। ২০২৪ সালের নভেম্বরে যাত্রা শুরু করা এই স্বাধীন পরিবেশবিষয়ক অনলাইন সংবাদমাধ্যম দুই বছর না পেরোতেই পৌঁছে যাচ্ছে বিশ্ব জলবায়ু আলোচনার মঞ্চে। আগামী ৯ থেকে ২০ নভেম্বর তুরস্কের আন্তালিয়ায় অনুষ্ঠেয় জাতিসংঘ জলবায়ু সম্মেলনে (কপ৩১) আট সাংবাদিকের একটি দল পাঠাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। দলে আছেন পাঁচজন পূর্ণকালীন প্রতিবেদক ও তিনজন আঞ্চলিক প্রদায়ক, বাংলাদেশ, নেপাল, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা থেকে।
উপকূলের কান্না থেকে একটি বার্তাকক্ষ
দ্য ক্লাইমেট ওয়াচের গল্পের শিকড় দেশের উপকূলে। বছরের পর বছর ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন, লবণাক্ততা, বন্যা আর বাস্তুচ্যুতির খবর করতে উপকূলীয় জেলাগুলো চষে বেড়িয়েছেন ইলিয়াস। দেখেছেন ঘর হারানো পরিবার, জীবিকা বাঁচাতে লড়তে থাকা কৃষক, আর এমন সব মানুষ, যাঁদের জীবন বদলে দিচ্ছে এমন এক পরিবর্তন, যার ওপর তাঁদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।
“কণ্ঠহীন মানুষের কণ্ঠ হতেই আমি সাংবাদিকতায় এসেছি,” বলেন ইলিয়াস। “আমি সব সময় বিশ্বাস করেছি, সাংবাদিকতা সেই প্রান্তিক মানুষদের প্রতিনিধিত্ব করবে, যাঁদের কষ্ট প্রায়ই শিরোনামের বাইরে থেকে যায়।”
তিনি বলেন, “বাংলাদেশের প্রায় সব উপকূল আমি ঘুরেছি। জলবায়ুজনিত দুর্যোগে মানুষকে ঘর, জীবিকা, এমনকি পরিচয় হারাতে দেখেছি। তাঁদের কষ্ট আমাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। সেই উপলব্ধি থেকেই দ্য ক্লাইমেট ওয়াচ, তাঁদের গল্প বলতেই হবে।”
ভাবনাটা সরল, কিন্তু আর্থিকভাবে কঠিন। রাজনৈতিক বিতর্ক বা চাঞ্চল্যকর খবরে পাঠক টানার প্রতিযোগিতায় না নেমে এমন একটি সংবাদমাধ্যম গড়া, যার পুরো মনোযোগ থাকবে জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশ সুরক্ষা, জীববৈচিত্র্য, টেকসই উন্নয়ন আর জলবায়ু ন্যায্যতায়। ইলিয়াস খোঁজ নিতে শুরু করলেন, কীভাবে একটি স্বাধীন ডিজিটাল বার্তাকক্ষ দাঁড় করানো যায়। নাম কী হবে, ওয়েবসাইট কীভাবে বানাবেন, একটি সংবাদপ্রতিষ্ঠান চালাতে কী কী লাগে।
নামটা এল এক যাত্রাপথে। ঢাকা থেকে ফেরার পথে সহকর্মী পরিবেশ সাংবাদিক মোস্তফা ইউসুফের সঙ্গে ভাবনাটি নিয়ে কথা বলছিলেন তিনি। সেই আলাপেই ঠিক হয়ে যায় নাম, দ্য ক্লাইমেট ওয়াচ। এরপর ডোমেইন কেনা, ওয়েবসাইট তৈরির কাজ শুরু।
পেছনে কোনো বড় বিনিয়োগকারী ছিল না। ইলিয়াস জানান, ওয়েবসাইট তৈরি, পরীক্ষামূলক সম্প্রচার আর আনুষ্ঠানিক যাত্রার পুরো খরচ তিনি জুগিয়েছেন সাংবাদিকতার বেতন থেকে। কিছুদিন পরীক্ষামূলকভাবে চলার পর ২০২৪ সালের ৩ নভেম্বর ঢাকায় আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে দ্য ক্লাইমেট ওয়াচ। পরে সীমিত বিজ্ঞাপন আয়, সাংবাদিকতা অনুদান আর প্রকল্পভিত্তিক সহযোগিতা প্রতিবেদনের কাজে কিছুটা ভরসা জোগায়।
ওয়েবসাইট দাঁড় করানো ছিল প্রথম ধাপ। সংবাদমাধ্যম হিসেবে সরকারি স্বীকৃতি পাওয়া ছিল আরেক লড়াই। সেই সময়ের সাক্ষী চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক সালেহ নোমান। তিনি বলেন, “ইলিয়াস অসম্ভব পরিশ্রমী একজন সাংবাদিক। একবার লক্ষ্য ঠিক করলে তা অর্জনে অবিরাম খেটে যান। দ্য ক্লাইমেট ওয়াচের নিবন্ধনের জন্য তিনি বারবার ঢাকায় গেছেন, আর্থিক কষ্টে পড়েছেন, প্রক্রিয়া চালিয়ে নিতে ধারও করতে হয়েছে তাঁকে।”
নানাভাবে পাশে থাকা সালেহ নোমানের চোখে, “ইলিয়াসের ভাবনা সব সময় ভৌগোলিক সীমানা ছাড়িয়ে যায়। দ্য ক্লাইমেট ওয়াচ সেই দূরদর্শিতারই উদাহরণ।”
শেষ পর্যন্ত তথ্য অধিদপ্তরের (পিআইডি) নিবন্ধন পায় প্রতিষ্ঠানটি। স্বীকৃতি মিলল, কিন্তু সামনে রয়ে গেল আরও বড় চ্যালেঞ্জ: সীমিত সামর্থ্য নিয়ে মানসম্পন্ন সাংবাদিকতা করে যাওয়া।
যে অনুসন্ধান পৌঁছাল আদালতে
মূলধারার বার্তাকক্ষে যেসব বিষয় ধারাবাহিক মনোযোগ কম পায়, সেগুলোই হয়ে উঠল দ্য ক্লাইমেট ওয়াচের কাজের জায়গা। জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়া, বড় অবকাঠামো প্রকল্পের পরিবেশগত মূল্য।
এর একটি অনুসন্ধান চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে। জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ঘিরে উপকূলীয় বন উজাড়, বন্যপ্রাণীর আবাস ধ্বংস আর প্রাকৃতিক সম্পদনির্ভর মানুষের ক্ষতি নথিভুক্ত করে প্রতিষ্ঠানটি। সেই প্রতিবেদন পরে প্রকল্পটির পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে জনপরিসরের বিতর্কে জায়গা করে নেয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড জানায়, অর্থনৈতিক অঞ্চলটি নিয়ে দায়ের হওয়া জনস্বার্থ মামলায় যেসব তথ্য উদ্ধৃত হয়েছে, তার মধ্যে দ্য ক্লাইমেট ওয়াচের প্রকাশিত তথ্যও আছে।
আরেকটি অনুসন্ধান বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে চলা ১৭ কোটি ৫০ লাখ ডলারের টেকসই বন ও জীবিকা (সুফল) প্রকল্প নিয়ে। দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধানের তথ্য ধরে প্রতিষ্ঠানটি দেখিয়েছে, কক্সবাজারের রামুতে একটি এলাকায় বনায়নের লক্ষ্যমাত্রা আর যাচাই করে পাওয়া প্রকৃত চারা রোপণের মধ্যে ফারাক রয়েছে। তবে বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, তাদের তদারকিতে আর্থিক অনিয়ম ধরা পড়েনি।
গাছের আচ্ছাদন কমে যাওয়া, ভূগর্ভস্থ পানির সংকট, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জলবায়ু অর্থায়ন আর ডিজিটাল উন্নয়নের পরিবেশগত মূল্য নিয়েও প্রতিবেদন করেছে সংবাদমাধ্যমটি। এসব প্রতিবেদন উদ্ধৃত বা সংযুক্ত করেছে দ্য গার্ডিয়ান, দ্য ডিপ্লোম্যাট, মোঙ্গাবে ও দ্য নিউ হিউম্যানিটারিয়ানের মতো আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম। একাডেমিক গবেষকেরাও তাদের কাজ ব্যবহার করেছেন।
২০২৬ সালে এল বড় স্বীকৃতি। ইন্টারনিউজের আর্থ জার্নালিজম নেটওয়ার্কের সমন্বয়ে এশিয়ার ১১ দেশের ১৪টি বার্তাকক্ষ মিলে করেছিল একটি যৌথ অনুসন্ধান, “ডার্ক সাইড অব দ্য বুম”। এশিয়ায় দ্রুত বাড়তে থাকা ডিজিটাল অবকাঠামোর পরিবেশগত মূল্য খুঁজেছে এই অনুসন্ধান। এর বাংলাদেশ অধ্যায় লিখেছেন ইলিয়াস, যেখানে উঠে এসেছে ডেটা সেন্টারের বিদ্যুৎ চাহিদা, ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন আর পরিবেশগত তদারকির চিত্র।
যৌথ অনুসন্ধানটি জিতেছে ২০২৬ সালের কাভারিং ক্লাইমেট নাউ জার্নালিজম অ্যাওয়ার্ড (লার্জ প্রজেক্টস অ্যান্ড কোলাবোরেশনস বিভাগ) এবং সোসাইটি অব পাবলিশার্স ইন এশিয়ার (সোপা) পরিবেশ বিষয়ক প্রতিবেদনের শ্রেষ্ঠত্বের পুরস্কার (আঞ্চলিক ও স্থানীয় বিভাগ)। সাংবাদিকতায় উদ্ভাবনের জন্য ২০২৬ সালের অসবর্ন এলিয়ট প্রাইজের বিশেষ স্বীকৃতিও পেয়েছে প্রকল্পটি। স্বীকৃতিগুলো বহুদেশীয় এই যৌথ উদ্যোগের, আর তার অংশীদার ছিল দ্য ক্লাইমেট ওয়াচ। যে সংবাদমাধ্যমের জন্ম প্রতিষ্ঠাতার ব্যক্তিগত সঞ্চয়ে, তার জন্য এমন আন্তর্জাতিক প্রকল্পে জায়গা পাওয়া নিঃসন্দেহে বড় মাইলফলক।
অনুসন্ধানের বাইরেও প্রতিষ্ঠানটির কাজের একটি কোমল দিক আছে, পাখি। “বার্ডস ইন ক্লাইমেট ক্রাইসিস” উদ্যোগে তারা বানাচ্ছে ১০০টি স্বল্পদৈর্ঘ্যের প্রামাণ্যচিত্র, যেখানে উঠে আসছে পাখির প্রজাতি, বদলে যাওয়া আবাস আর সামনে থাকা হুমকি। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, ২৫টি পর্ব এরই মধ্যে তৈরি হয়েছে। দুই ভাষার এই সিরিজে জায়গা পেয়েছে চাঁদিঠোঁট মুনিয়া, লালচে কাঠঠোকরা, সাধারণ প্রিনিয়া, দেশি কানিবক আর সবুজ সুইচোরা। বন সংরক্ষণ, জলাভূমি, বন্যপ্রাণী, আলোদূষণ আর প্রতিবেশ পুনরুদ্ধার নিয়েও খবর করছে তারা। জলবায়ু ন্যায্যতা বিভাগে কেন্দ্রে রাখা হচ্ছে নারী, তরুণ, আদিবাসী, উপকূলবাসী আর দুর্যোগে বাস্তুচ্যুত পরিবারের অভিজ্ঞতা। পাশাপাশি সাংবাদিকতা প্রশিক্ষণ চালায় প্রতিষ্ঠানটি, আর সেন্টার ফর পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (সিপিআরডি) সঙ্গে মিলে প্রতিবছর আয়োজন করে কপ-পূর্ব রিপোর্টিং ফেলোশিপ।
আন্তালিয়ায় দক্ষিণ এশিয়ার গল্প
দুবাইয়ে কপ২৮, বাকুতে কপ২৯, ব্রাজিলের বেলেমে কপ৩০ আর জার্মানির বনের জলবায়ু আলোচনা কাভারের অভিজ্ঞতা নিয়ে এবার আন্তালিয়ায় যাচ্ছে দ্য ক্লাইমেট ওয়াচ। এবারের লক্ষ্য আঞ্চলিক উদ্বেগকে আরও বড় জায়গা দেওয়া। জলবায়ু অর্থায়ন, অভিযোজন, ক্ষয়ক্ষতি (লস অ্যান্ড ড্যামেজ), জ্বালানি রূপান্তর আর ঝুঁকিতে থাকা মানুষের অভিজ্ঞতা থাকবে কাভারেজের কেন্দ্রে। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, তাদের নেটওয়ার্কে যুক্ত আছেন দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় ১০০ জলবায়ু ও পরিবেশ সাংবাদিক। কপ৩১ কাভারেজে শক্তি ফাউন্ডেশন, ইয়ং পাওয়ার ইন সোশ্যাল অ্যাকশন (ইপসা) ও চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের সহযোগিতাও নিচ্ছে তারা।
প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী সম্পাদক মো. ইব্রাহিম খলিলুল্লাহ বলেন, লক্ষ্য শুধু আলোচকেরা কী বললেন তা জানানো নয়, বরং আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে মানুষের অভিজ্ঞতার যোগসূত্র তৈরি করা। তাঁর ভাষায়, “বৈশ্বিক জলবায়ু আলোচনায় আমরা দক্ষিণ এশিয়ার কণ্ঠস্বর হয়ে উঠতে চাই। জলবায়ু পরিবর্তনে আমাদের দেশগুলো সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। তাই নিজেদের গল্প নিজেদেরই বলা জরুরি, শুধু অন্যদের ওপর নির্ভর করে থাকলে চলবে না।”
পথটা এখনো সহজ নয়। দ্য ক্লাইমেট ওয়াচ এখনো একটি তরুণ, সীমিত সামর্থ্যের সংবাদমাধ্যম, পরিবেশ সাংবাদিকতায় টেকসই জায়গা গড়ার লড়াই চলছে প্রতিদিন। কিন্তু এক মাস ধরে সম্পাদককে বোঝাতে থাকা এক প্রতিবেদকের জেদ আজ রূপ নিয়েছে চার দেশের সাংবাদিককে যুক্ত করা একটি বার্তাকক্ষে। যার মূল বিশ্বাস খুব সরল: পরিবেশের বদল নিরন্তর নজরদারির দাবি রাখে, আর সেই বদলের দাম যাঁরা দিচ্ছেন, পৃথিবী কোন গল্প শুনবে তা ঠিক করার অধিকার তাঁদেরও আছে।
এস আই/














Discussion about this post