লস অ্যাঞ্জেলেসের সোফাই স্টেডিয়ামে তখন বেলজিয়ান রেড ডেভিলসদের একের পর এক আক্রমণের ঝড়। কেভিন ডি ব্রুইনা কিংবা রোমেলু লুকাকুদের বিশ্বসেরা আক্রমণভাগের সামনে খড়কুটোর মতো উড়ে যাওয়ার শঙ্কায় ইরানের রক্ষণভাগ। তবে সব হিসাব-নিকাশ ওলটপালট করে দিয়ে পোস্টের নিচে একাই যেন ‘চীনের প্রাচীর’ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন একজন—৩৩ বছর বয়সী অভিজ্ঞ গোলরক্ষক আলিরেজা বেইরানভান্দ।
বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম রোমাঞ্চকর এক লড়াইয়ে ১০ জনের বেলজিয়ামকে গোলশূন্য ড্রয়ে রুখে দিয়ে ফুটবল বিশ্বে হইচই ফেলে দিয়েছে পারসিয়ানরা। আর এই অবিস্মরণীয় রূপকথার মহানায়ক তাদের ১৯৫ সেন্টিমিটার উচ্চতার এই দীর্ঘদেহী গোলপ্রহরী।
গ্রুপ ‘জি’-র এই হাইভোল্টেজ ম্যাচে তিন পয়েন্টের খোঁজে মরিয়া র্যাঙ্কিংয়ের ৯ নম্বরে থাকা বেলজিয়াম ২৩টি শট নেয়, যার ৭টিই ছিল লক্ষ্য বরাবর। তবে প্রতিবারই বেইরানভান্দের ইস্পাতকঠিন দৃঢ়তায় হতাশ হতে হয়েছে ইউরোপের দলটিকে। প্রথমার্ধে ডি ব্রুইনার বানিয়ে দেওয়া বল থেকে লুকাকুর দুটি নিশ্চিত অন-টার্গেট শট অবিশ্বাস্য রিফ্লেক্সে রুখে দেন এই ইরানি বাজপাখি।
ম্যাচের সবচেয়ে শ্বাসরুদ্ধকর মুহূর্তটি আসে দ্বিতীয়ার্থের শেষ দিকে, যখন বেলজিয়ান ডিফেন্ডার ম্যাক্সিম ডি কুইপার একদম কাছ থেকে গোল করার সুবর্ণ সুযোগ পেয়েছিলেন। বেইরানভান্দ বাম দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে প্রথম শটটি ঠেকানোর পর রিবাউন্ড থেকে আসা দ্বিতীয় শটটিও অবিশ্বাস্য ডাইভে গোললাইন থেকে রক্ষা করেন। ম্যাচজুড়ে ৭টি চোখ ধাঁধানো সেভ আর আকাশপথের নিখুঁত নিয়ন্ত্রণে ক্লিন শিট ধরে রেখে ম্যাচসেরার ট্রফিটি নিজের করে নেন বেইরানভান্দ। প্রথম ম্যাচে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ২ গোল হজম করা ইরানকে এই ১ মূল্যবান পয়েন্ট এনে দিয়ে এখন নকআউটের স্বপ্ন দেখাচ্ছেন এই গোলকিপার।
তবে এই বীরত্বগাথার পেছনে লুকিয়ে আছে এক চড়াই-উতরাই ও জীবন সংগ্রামের গল্প। ইরানের লোরেস্তানের দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে এক যাযাবর কুর্দি পরিবারে জন্ম নেওয়া এই কিশোরের শৈশব কেটেছিল চরম দারিদ্র্যে। পরিবারের পশুপালনের কাজে ভেড়া রক্ষা করার জন্য শৈশবে ‘ডালপারান’ নামের একটি স্থানীয় খেলা খেলতেন তিনি, যেখানে বিশাল দূরত্বে ভারী পাথর ছুঁড়তে হতো।
পাহাড়ি অঞ্চলের সেই জীবন সংগ্রামই যেন তার শরীরের ওপরের অংশে এমন এক অবিশ্বাস্য শক্তি তৈরি করেছিল, যা আধুনিক ফুটবলে বিরল। আর সেই শক্তির জোরেই আজ তিনি দুটি ভিন্ন কৃতিত্বের জন্য অফিশিয়ালি গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডধারী। ২০১৬ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে ২০০.১৪ ফুট দূরত্বে বল ছুঁড়ে ফুটবলে এযাবৎকালের দীর্ঘতম নিক্ষেপের রেকর্ড গড়েন তিনি। এছাড়া ২০১৯ সালে ২৫৫.৯৫ ফুট দূরত্বের ফুটবল ইতিহাসের দীর্ঘতম ড্রপ কিকের রেকর্ডটিও নিজের করে নেন বেইরানভান্দ, যা ম্যানচেস্টার সিটির ব্রাজিলিয়ান গোলরক্ষক এডারসনের রেকর্ডকে ছাড়িয়ে যায়।
আন্তর্জাতিক ফুটবলে ৮৩টি ম্যাচ খেলা বেইরানভান্দের এটি ক্যারিয়ারের তৃতীয় বিশ্বকাপ মিশন। ২০১৮ এবং ২০২২ বিশ্বকাপেও ইরানের প্রথম পছন্দের গোলরক্ষক ছিলেন তিনি। ২০১৮ বিশ্বকাপে বিশ্বসেরা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর পেনাল্টি ঠেকিয়ে যিনি প্রথমবার বিশ্বমঞ্চে আলোড়ন তুলেছিলেন, ২০২৬-এ এসে বেলজিয়ামের বিপক্ষে পারফরম্যান্সে প্রমাণ করলেন—বয়স বাড়লেও তার দক্ষতায় কোনো ভাটা পড়েনি।
বর্তমানে ইরানের ঘরোয়া লিগের ক্লাব ট্রাক্টরের হয়ে খেলা বেইরানভান্দ অতীতে পার্সিপোলিস, বোয়াভিস্তা এবং খোদ বেলজিয়ামের ক্লাব রয়্যাল অ্যান্টওয়ার্পের হয়েও মাঠ মাতিয়েছেন, যেখানে ২০১৯-২০ মৌসুমে বেলজিয়ান কাপ জেতার কৃতিত্ব রয়েছে তাঁর।
টানা চার মৌসুম ইরানের শীর্ষ লিগের সেরা গোলরক্ষক এবং ২০১৯ সালের বর্ষসেরা ফুটবলারের তকমা পাওয়া এই ফুটবলার আজ শুধু ইরানের দেয়াল নন; দুর্গম পাহাড়ের রাখাল ছেলে থেকে বিশ্বমঞ্চের মহানায়ক হয়ে ওঠা আলিরেজা বেইরানভান্দ আজ কোটি ফুটবলপ্রেমীর এক অনন্য অনুপ্রেরণার নাম।
এম এইচ/














Discussion about this post