দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর স্থল আগ্রাসন তীব্র প্রতিরোধের মুখে পড়ে স্থবির হয়ে পড়েছে।
হিজবুল্লাহর উন্নত ও আধুনিক যুদ্ধকৌশলের সামনে ইসরায়েলি সেনারা দিন দিন আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। সম্প্রতি প্রকাশিত মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর এক বিশ্লেষণাত্মক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কয়েক মাসের লড়াইয়ের পরও লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান কার্যত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে এবং হিজবুল্লাহ আগের চেয়েও বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হিজবুল্লাহর ফাইবার-অপটিক চালিত ফার্স্ট-পার্সন-ভিউ কামিকাজে (আত্মঘাতী) ড্রোনের ব্যাপক ব্যবহার ইসরায়েলি বাহিনীকে সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত অবস্থায় ফেলেছে এবং তাদের স্থল কৌশলকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করেছে। একটি প্রকাশিত ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, হিজবুল্লাহর একটি নিচু দিয়ে উড়ে আসা ড্রোন নিখুঁতভাবে দক্ষিণ লেবাননে থাকা একটি ইসরায়েলি সাঁজোয়া যানকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়।
প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ড্রোনগুলো ফাইবার-অপটিক তারের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়, যার ফলে প্রচলিত কোনো ইলেকট্রনিক জ্যামিং সিস্টেম দিয়ে এদের অকেজো করা সম্ভব নয়। ইসরায়েলি সামরিক বিশ্লেষক বোয়াজ হায়েতজনি এই প্রযুক্তি সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন, এই ড্রোন হলো একটি প্রযুক্তিগত ছুরি। এর খরচ অত্যন্ত কম, যন্ত্রাংশ অনলাইনে কিনতে পাওয়া যায় এবং অপারেটরকে লক্ষ্যবস্তুর কাছাকাছিও যেতে হয় না। কিলোমিটার দূর থেকেই অপারেটর সবকিছু দেখতে পান।
তিনি আরও স্বীকার করেন যে, ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর কাছে বর্তমানে এই ফাইবার-অপটিক ড্রোনের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো প্রতিরক্ষামূলক জবাব নেই।
লেবাননের প্রতিরোধ যোদ্ধা দল হিজবুল্লাহ বুধবার (৩ জুন) দক্ষিণ লেবাননের আল-বাইয়াদা শহরে ইসরায়েলি বাহিনীর ওপর ধারাবাহিক ও সমন্বিত হামলা চালানোর ঘোষণা দিয়েছে। হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকে জানানো হয়, তারা আল-বাইয়াদায় অবস্থিত একটি ইসরায়েলি সামরিক কমান্ড সেন্টারে রকেট ব্যারাজ নিক্ষেপ করেছে। এছাড়া, শহরটিতে অবস্থানরত একটি ইসরায়েলি সামরিক ইউনিটকে লক্ষ্য করে পরপর দুটি পৃথক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়। একই এলাকায় হিজবুল্লাহর যোদ্ধারা গাইডেড মিসাইল ব্যবহার করে ইসরায়েলের দুটি অত্যাধুনিক মেরকাভা ট্যাংক সম্পূর্ণ ধ্বংস করার দাবি করেছে।
ইসরায়েলি সামরিক সূত্র সোমবারের হামলায় মাত্র দুই সেনা নিহত এবং দশজন আহত হওয়ার কথা স্বীকার করলেও, হিজবুল্লাহর প্রকাশিত ভিডিওতে লেবানন এবং ইসরায়েল অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড-উভয় অঞ্চলেই ইসরায়েলি সেনা ও কমান্ডারদের ওপর ড্রোনের নিখুঁত আঘাত হানার দৃশ্য দেখা গেছে।
দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস তাদের বিশ্লেষণে উল্লেখ করেছে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সম্প্রতি বৈরুতের দক্ষিণ শহরতলিতে ব্যাপক বোমাবর্ষণের যে হুমকি দিয়েছিলেন এবং পরবর্তীতে তা থেকে পিছু হটেছেন, তা মূলত যুদ্ধক্ষেত্রে ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান ব্যর্থতারই প্রতিফলন।
পত্রিকাটি লিখেছে, যখন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী সোমবার সতর্ক করেছিলেন যে বিমান বাহিনী শীঘ্রই বৈরুতের শহরতলিতে বোমা হামলা চালাবে, তখন সেটি কেবল একটি হুমকি ছিল না। এটি ছিল এই যুদ্ধের কৌশল যে ব্যর্থ হচ্ছে, তার একটি স্পষ্ট স্বীকৃতি।
ইসরায়েলি বাহিনী মূলত দক্ষিণ লেবাননে একটি বাফার জোন বা সুরক্ষিত অঞ্চল তৈরি করতে এবং হিজবুল্লাহকে সীমান্ত থেকে দূরে ঠেলে দিতে এই আগ্রাসন শুরু করেছিল। তবে মার্কিন প্রতিবেদনটি নিশ্চিত করেছে যে, হিজবুল্লাহর প্রতিরোধ কাঠামো কেবল অক্ষতই নেই, বরং আগ্রাসন শুরুর সময়ের চেয়ে তারা এখন বহুগুণ বেশি সামরিক সক্ষমতা ও দক্ষতার পরিচয় দিচ্ছে।
একই সাথে হিজবুল্লাহ হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, ইসরায়েল যদি বৈরুতে পুনরায় বড় ধরনের হামলা চালায়, তবে তারা ইসরায়েল অধিকৃত ভূখণ্ডের গভীরে সুদূরপ্রসারী ও মারাত্মক পাল্টা আঘাত হানবে।
সূত্র: প্রেস টিভি
এম এইচ/














Discussion about this post