সব জল্পনা-কল্পনা ও মৃত্যুর গুজব উড়িয়ে দিয়ে ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনির বিদায়ী শোকযাত্রায় আচমকা জনসমক্ষে হাজির হয়েছেন দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদ। গত সোমবার (৬ জুন) রাজধানী তেহরানের রাস্তায় কালো জ্যাকেট ও মুখে মাস্ক পরা অবস্থায় লাখো শোকাহত মানুষের ভিড়ের মধ্যে তাকে হেঁটে যেতে দেখা যায়।
গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ হামলার প্রথম দিনেই সর্বোচ্চ নেতা খামেনিসহ ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের অনেকেই নিহত হন। সে সময় ইরানের রাষ্ট্রীয় ঘনিষ্ঠ কয়েকটি গণমাধ্যমে খবর রটেছিল, নিজের বাড়ির কাছে একটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানায় ২০০৫ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করা মাহমুদ আহমাদিনেজাদও ‘নিহত’ হয়েছেন। এরপর দীর্ঘ কয়েক মাস তাকে আর কোথাও দেখা যায়নি এবং সরকারের পক্ষ থেকেও তার ভাগ্য নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য দেওয়া হয়নি। ফলে যুদ্ধের শুরুর দিককার বিশৃঙ্খলার মধ্যে তার বেঁচে থাকা নিয়ে তীব্র ধোঁয়াশা ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। অবশেষে খামেনির শেষকৃত্যে অংশ নিয়ে তিনি নিজের জীবিত থাকার প্রমাণ দিলেন।
খামেনির এই ঐতিহাসিক শোকযাত্রায় ইরানের জীবিত অন্য দুই সাবেক প্রেসিডেন্ট- মোহাম্মদ খাতামি ও হাসান রুহানি অনুপস্থিত ছিলেন। সমালোচকদের দাবি, কট্টরপন্থী না হওয়ায় তাদের এই রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণই জানানো হয়নি।
এদিকে জানাজা ও শোকযাত্রার সব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হলেও দেশের নতুন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি এবারও জনসমক্ষে আসেননি। পিতার উত্তরসূরি হিসেবে গত সপ্তাহে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে কঠোর নিরাপত্তার কারণে তিনি সম্পূর্ণ আড়ালে রয়েছেন। তবে গত রোববার খামেনির জানাজার নামাজে সামনের সারিতে দাঁড়িয়েছিলেন তার অন্য তিন ছেলে—মোস্তফা, মাসউদ ও মেইসাম। বাবার মৃত্যুর পর এই প্রথম তাদের জনসমক্ষে আবেগাপ্লুত ও অশ্রুসিক্ত অবস্থায় দেখা গেছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের হেলিকপ্টার থেকে ধারণ করা ফুটেজে রাজধানী তেহরানের কেন্দ্রজুড়ে মানুষের নজিরবিহীন ঢল দেখা গেছে। কর্তৃপক্ষের ধারণা, খামেনির বিদায়ী জানাজা ও শোকযাত্রায় প্রায় দুই কোটি মানুষের সমাগম হয়েছে, যা ১৯৮৯ সালে ইমাম খোমেনির জানাজার স্মৃতিকে মনে করিয়ে দেয়।
শোকযাত্রায় অংশ নেওয়া লাখ লাখ মানুষ এ সময় বুক চাপড়ে স্লোগান দেন, আমার শহীদ নেতা, আপনার পথচলা অব্যাহত থাকবে; আমার শহীদ পিতা, আপনার রক্ত বৃথা যাবে না।
শোকযাত্রায় খামেনির কফিনটি ইরানের জাতীয় পতাকায় মোড়ানো ছিল। একই ট্রাকে ২৮শে ফেব্রুয়ারির হামলায় নিহত তার পরিবারের অন্য ৪ সদস্যের (যার মধ্যে ১৪ মাস বয়সী নাতনিও রয়েছে) কফিনও রাখা হয়।
প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এবং পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফসহ দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক ব্যক্তিত্বরা এই মিছিলে অংশ নেন। গত শনিবার শুরু হওয়া এই রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠান আগামী বৃহস্পতিবার পর্যন্ত চলবে। তেহরানের আনুষ্ঠানিকতা শেষে খামেনির মরদেহ পবিত্র শহর কোম এবং ইরাকের নাজাফ ও কারবালায় পৃথক শোকানুষ্ঠানের জন্য নিয়ে যাওয়া হবে। সবশেষে আগামী বৃহস্পতিবার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের শহর মাশহাদে অবস্থিত পবিত্র ইমাম রেজার মাজারে তাকে দাফন করা হবে।














Discussion about this post