যুদ্ধ থেমেছে, কিন্তু রাজনীতির অগ্নিগর্ভ মঞ্চে এখনো জ্বলছে নতুন এক আগুন। গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জন্য যেন এই শান্তিই নিয়ে এসেছে আরও ভয়ংকর সময়। গাজা যুদ্ধবিরতিকে তার বিজয় হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করলেও সাবেক ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত আলন পিনকাসসহ অনেকের মতে, এ যুদ্ধবিরতি ছিল মূলত সাজানো নাটক; যা হোয়াইট হাউসের চাপে নেতানিয়াহু মানতে রাজি হয়েছেন। কারণ, ওয়াশিংটন গাজা যুদ্ধের আর্থিক ও কূটনৈতিক বোঝা বইতে আর রাজি ছিল না।
তাই আকাশে ধোঁয়া না থাকলেও নেতানিয়াহু চারপাশে ঘনিয়ে আসছে ষড়ভুজ বিপদ। একটি দুটি নয়, ছয় ছয়টি চ্যালেঞ্জ তার সামনে, যা তার ভবিষ্যৎকে টলিয়ে দিতে পারে যে কোনো মুহূর্তে। এমনটাই মনে হচ্ছে কিছু পর্যবেক্ষকের চোখে। চলুন, একে একে দেখে নেওয়া যাক সেই চ্যালেঞ্জগুলো।
১. আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কি আরও একা হয়ে পড়বেন নেতানিয়াহু
দুই বছরের ভয়াবহ হামলায় গাজায় নিহত হয়েছেন হাজারো ফিলিস্তিনি। ক্ষুধা, ধ্বংস আর শিশুর কান্নায় আজ বিশ্বজুড়ে ক্ষোভের ঝড়। একের পর এক দেশ মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে ইসরায়েল থেকে। এমনকি জাতিসংঘ অধিবেশনে নেতানিয়াহু মঞ্চে দাঁড়ালে অনেকে বেরিয়ে যান কক্ষ থেকে। এ যেন এক বাস্তব ছবি যেখানে ইসরায়েল একা, আর নেতানিয়াহু আরও একা। তার “সুপার স্পার্টা” বানানোর স্বপ্ন অর্থনীতিতে নামিয়েছে ধস, বিনিয়োগকারীরাও মুখ ফিরিয়ে নিয়ে স্পষ্টভাবে বলেছেন “তারা স্পার্টা নন।”
২. ডানপন্থীরা ভেঙে দিতে পারেন নেতানিয়াহুর জোট সরকার
অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ ও নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন গভির যুদ্ধবিরতির তীব্র বিরোধিতা করলেও এখনো আছেন জোটে। কিন্তু কবে তারা বিদ্রোহ করবেন, বলা মুশকিল। সেই ভয়েই নেতানিয়াহু ধর্মীয় শিক্ষার্থীদের ছাড় দিতে চাইছেন সেনাবাহিনী থেকে, যাতে আলট্রা-অর্থডক্স দলগুলো তাকে আঁকড়ে ধরে থাকে।
৩. আইসিসি ও আইসিজে দোষী সাব্যস্ত করতে পারেন নেতানিয়াহু ও ইসরায়েলকে
আইসিসি ইতিমধ্যেই তার ও সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী গ্যালান্টের বিরুদ্ধে জারি করেছে যুদ্ধাপরাধের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা। আইসিজেতেও চলছে জাতিহত্যার মামলা। দোষী প্রমাণিত হলে হতে পারে দীর্ঘ কারাদণ্ড, আর এতে তার নাম ইতিহাসে লেখা হবে যুদ্ধাপরাধীর তালিকায়।
৪. ট্রাম্প পরিত্যাগ করতে পারেন নেতানিয়াহুকে
এ সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রই ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় আর্থিক, সামরিক ও কূটনৈতিক ভরসা। ওয়াশিংটনের সমর্থন ছাড়া ইসরায়েল আর নেতানিয়াহু পড়বেন মারাত্মক বিপদে। ট্রাম্প মনে করছেন, নেতানিয়াহু তাকে ব্যবহার করেছেন। একসময় তাকে ‘ধোঁকা দিচ্ছেন’ বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি। যুদ্ধবিরতির পর ট্রাম্প প্রকাশ্যেই বলেন, “আমি না বলা পর্যন্ত ইসরায়েল গাজায় যাবে না।” যদি নেতানিয়াহু সেই স্থিরতা ভাঙেন, তাহলে হয়তো উবে যাবে ট্রাম্পের সমর্থন, তখন তা হবে শুধুই সময়ের ব্যাপার।
৫. ৭ অক্টোবরের হামলার আগে নিরাপত্তা ব্যর্থতা নিয়ে হতে পারে তদন্ত
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের আক্রমণে ১,১০০ জনেরও বেশি নিহত হয়। সেনা ও গোয়েন্দা সংস্থার ব্যর্থতা এখন প্রকাশ্যে, পৃথক তদন্তের পর সেনাবাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান দুজনই করেন পদত্যাগ। নেতানিয়াহু সব তদন্ত মানলেও নিজের ভূমিকা নিয়ে তদন্তের বিরোধী। কিন্তু সর্বোচ্চ আদালত বলেছেন আর দেরি নয়। এবার তাকেও দিতে হবে এর জবাব।
৬. নেতানিয়াহুর আছে জেলে যাওয়ার আশঙ্কা
ঘুষ, জালিয়াতি ও আস্থাভঙ্গের অভিযোগে তিনটি মামলা চলছে তার বিরুদ্ধে। দোষী প্রমাণিত হলে হতে পারে ১০ বছরের কারাদণ্ড। গেলো সোমবার ট্রাম্প ইসরায়েলের পার্লামেন্টে দেওয়া ভাষণে দেশটির প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগকে নেতানিয়াহুকে ক্ষমা করে দেওয়ার আহ্বান জানান। মজা করে বলেন, ‘সিগার আর শ্যম্পেন নিয়ে কি কারও মাথাব্যথা আছে?’ কিন্তু এই রসিকতার ভেতরেই লুকিয়ে আছে রাজনৈতিক বাস্তবতা যেখানে নেতানিয়াহুর ভবিষ্যৎ হয়তো এখন আদালতের কাঠগড়ায়।
যুদ্ধ থেমেছে, কিন্তু নেতানিয়াহুর জীবনের যুদ্ধ যেন সবে শুরু হয়েছে। একদিকে আদালত, অন্যদিকে মিত্রদের অনাস্থা, আর দেশের ভেতরে রাজনৈতিক অস্থিরতা সব মিলিয়ে শান্তির পর তার জীবনে এসেছে এক অদ্ভুত ঝড়।
এস এইচ/














Discussion about this post