যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান যুদ্ধের প্রভাবে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) থেকে হাজার হাজার পাকিস্তানি শিয়া মুসলিমকে বিতাড়িত করা হচ্ছে। বছরের পর বছর প্রবাসে তিলে তিলে গড়া সঞ্চয়, চাকরি ও সহায়-সম্বল হারিয়ে শূন্য হাতে দেশে ফিরতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।
রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের চাকওয়াল জেলার গ্রামীণ এলাকায় এরই মধ্যে ১০০ জনেরও বেশি শিয়া মুসলিম খালি হাতে ফিরেছেন। পাকিস্তানি শিয়া রাজনৈতিক সংগঠন মজলিস ওয়াহাদাত-ই-মুসলেমিন-এর সংগৃহীত তথ্যমতে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলা শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত ৭,৫০০ শিয়াকে আমিরাত থেকে বিতাড়িত করা হয়েছে। তবে প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়েও অনেক বেশি বলে দাবি করেছেন সংগঠনের মুখপাত্র মহসিন আবিদি।
পাকিস্তানের শিয়া নেতাদের অভিযোগ, উপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই বিতাড়ন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়েছে; বিশেষ করে ইরান যখন আমিরাতে প্রতিশোধমূলক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। তবে আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে রয়টার্সের কাছে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সাম্প্রদায়িক কারণে বিতাড়নের বিষয়টি অস্বীকার করে দাবি করেছে যে, আমিরাতের নিয়ম ভঙ্গের কারণেই তাদের ফেরত পাঠানো হচ্ছে। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জ্যেষ্ঠ পাকিস্তানি কর্মকর্তা জানান, আমিরাত থেকে হাজার হাজার শিয়াকে বিতাড়নের বিষয়টি সরকার পর্যালোচনা করছে, কিন্তু ‘কূটনৈতিক কারণে’ তা প্রকাশ্যে আনা হচ্ছে না।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) এবং মেনা রাইটস গ্রুপ এই ঘটনাকে ‘অত্যন্ত উদ্বেগজনক’ আখ্যা দিয়ে তদন্ত শুরু করেছে। মেনা রাইটস গ্রুপের মানবাধিকার কর্মকর্তা ফালাহ সায়েদ জানান, শিয়াদের ওপর এই দমন-পীড়ন নতুন নয়, তবে সম্প্রতি এই ধরপাকড় চরম আকার ধারণ করেছে।
দুবাইতে প্রযুক্তি খাতে কর্মরত আলী আহমেদ নকভি জানান, ভিসা পরিবর্তনের সময় গত এপ্রিলে তার স্ত্রীকে আটক করে দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। পরে তাকেও কোনো কারণ না জানিয়ে আরও ৯৩ জন শিয়া বন্দির সঙ্গে একটি ফ্লাইটে তুলে দেওয়া হয়। খুররম জেলার বাসিন্দা লায়েক হোসেন ২০ বছর ধরে দুবাইতে থেকে একটি কার্গো ভ্যানের ব্যবসা দাঁড় করিয়েছিলেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে আমার সবকিছু শেষ হয়ে গেল।”
চাকওয়ালের এক নির্মাণ শ্রমিক জানান, আমিরাতের কর্মকর্তারা তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন তিনি ইরানে অর্থায়ন করেন কি না। ১৬ বছর ধরে দুবাই মেট্রোতে ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করা আরেক ব্যক্তি জানান, পুলিশ তার ফোন কেড়ে নিয়ে টানা ৯ দিন আটকে রাখে এবং পরে অন্ধকারাচ্ছন্ন একটি বাসে করে বিমানবন্দরে পাঠিয়ে দেয়। তিনি বলেন, “চোখের পলকে আমি আবারও শূন্যতে নেমে গেলাম।”
(উল্লেখ্য, প্রায় ১৮ লাখ পাকিস্তানি ইউএই-তে কাজ করেন, যারা বছরে ৬ বিলিয়ন বা ৬০০ কোটি ডলারেরও বেশি রেমিট্যান্স দেশে পাঠান। ইরানের পর পাকিস্তানেই বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ শিয়া জনসংখ্যা রয়েছে, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৭ শতাংশ।)
সূত্র: রয়টার্স
এস আই/














Discussion about this post