পদ্মার বুকজুড়ে এখন আর আগের মতো পানির স্রোত নেই। কমেছে নদীর গভীরতা ও পানির প্রবাহ। কোথাও জেগে উঠেছে চর, কোথাও বিস্তীর্ণ বালুচর। নদীর স্বাভাবিক গতিপথও বদলে গেছে অনেকাংশে। একসময় যে পদ্মা ছিল ইলিশসহ অসংখ্য দেশি মাছের নিরাপদ আবাসস্থল, সেই নদীতেই এখন মাছের দেখা মিলছে কম।
সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছে ইলিশ। একসময় বঙ্গোপসাগর থেকে পদ্মা হয়ে রাজশাহী পর্যন্ত ইলিশের বিচরণ ছিল নিয়মিত। জেলেদের জালে ধরা পড়ত ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ। এখন সেই দৃশ্য অনেকটাই অতীত। নদীতে অল্পসংখ্যক ইলিশ ধরা পড়লেও সেগুলোর বেশির ভাগই আকারে ছোট। ফলে শুধু মাছের সংকটই নয়, এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে পদ্মানির্ভর জেলেদের জীবন-জীবিকায়ও।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের পাশাপাশি উজানে ফারাক্কা বাঁধ, নদীর পানিপ্রবাহ কমে যাওয়া, অপরিকল্পিত ড্রেজিং, কৃষিতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার এবং নদীতে অবৈধ ও ক্ষতিকর জাল ব্যবহারের কারণে পদ্মার স্বাভাবিক পরিবেশ ক্রমেই বদলে যাচ্ছে। এর ফলে সংকুচিত হচ্ছে মাছের প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র। শুধু ইলিশ নয়, দেশি মাছের বহু প্রজাতিও এখন বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে।
আট বছরে ইলিশ আহরণ কমেছে ব্যাপকভাবে
রাজশাহী জেলা মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, পদ্মায় ইলিশের প্রাপ্যতা কতটা কমেছে, তার একটি স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যায় গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যানে।
২০২৫ সালের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রাজশাহীর গোদাগাড়ী, পবা, চারঘাট ও বাঘা—এই চার উপজেলায় মাত্র ৫ দশমিক ৩৭ টন ইলিশ ধরা পড়েছে। অথচ ২০১৬-১৭ অর্থবছরে একই অঞ্চলে ইলিশ আহরণের পরিমাণ ছিল ২৮ দশমিক ৫৫ টন।
অর্থাৎ মাত্র আট বছরের ব্যবধানে রাজশাহীতে ইলিশ আহরণ নেমে এসেছে আশঙ্কাজনক পর্যায়ে। পরিসংখ্যান শুধু ইলিশের সংখ্যা কমার তথ্যই দিচ্ছে না, এটি পদ্মার সামগ্রিক জলজ পরিবেশের পরিবর্তনেরও ইঙ্গিত দিচ্ছে।
স্থানীয় জেলেদের অভিজ্ঞতাও একই কথা বলছে। তাদের ভাষ্য, কয়েক বছর আগেও নির্দিষ্ট মৌসুমে পদ্মায় ইলিশের দেখা মিলত। এখন সারাদিন নদীতে জাল ফেলেও অনেক সময় ইলিশ পাওয়া যায় না। পাওয়া গেলেও বেশির ভাগই ছোট আকারের।
পানির প্রবাহ কমায় বাধাগ্রস্ত ইলিশের উজানযাত্রা
ইলিশ এমন একটি মাছ, যা সমুদ্র থেকে নদীর উজানের দিকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে প্রজননক্ষেত্রে যায়। এ যাত্রার জন্য প্রয়োজন নদীতে পর্যাপ্ত পানি, স্রোত ও নির্দিষ্ট গভীরতা। পদ্মায় পানির প্রবাহ ও গভীরতা কমে যাওয়ায় ইলিশের স্বাভাবিক চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীতে পানির গভীরতা কমে গেলে ইলিশের উজানে ওঠার পথ সংকুচিত হয়ে পড়ে। কোথাও নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে গেছে, কোথাও আবার চর ও বালুচর সৃষ্টি হয়েছে। ফলে মাছের স্বাভাবিক চলাচলের জন্য প্রয়োজনীয় জলপথ আর আগের মতো নেই।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে অপরিকল্পিত ড্রেজিং। নদীর বিভিন্ন অংশে পরিকল্পনাহীনভাবে ড্রেজিংয়ের ফলে পানিতে অতিরিক্ত বালু মিশে ঘোলাভাব তৈরি হচ্ছে। এতে মাছের স্বাভাবিক আবাসস্থল ও খাদ্যশৃঙ্খলও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।
ফারাক্কা বাঁধের প্রভাবও বড় কারণ
পদ্মার বর্তমান সংকটকে শুধু জলবায়ু পরিবর্তনের ফল হিসেবে দেখছেন না গবেষকেরা। এর সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে উজানে ফারাক্কা বাঁধের প্রভাবও রয়েছে বলে তাঁদের মত।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শামস মুহা. গালিব পদ্মা নদীর আয়তন কমে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করেছেন। তাঁর গবেষণায় উঠে এসেছে, ফারাক্কা বাঁধের প্রভাবে পদ্মার আয়তন প্রায় অর্ধেক কমে গেছে।
তিনি জানান, রাজশাহী জেলার গোদাগাড়ী থেকে চারঘাটের সারদা পর্যন্ত প্রায় ৭০ কিলোমিটার নদীপথকে গবেষণার আওতায় নেওয়া হয়েছিল। নদীর নয়টি পয়েন্ট থেকে মৎস্য প্রজাতির নমুনা সংগ্রহ করা হয়। পাশাপাশি পদ্মাপাড়ের ২৭টি জেলেপল্লি থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া ছবি বিশ্লেষণ করেও নদীর পরিবর্তিত চিত্র বোঝার চেষ্টা করা হয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, নদীর আয়তন ও গভীরতা কমার পাশাপাশি পানির প্রবাহও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এর ফলে মাছের আবাসস্থল সংকুচিত হয়েছে। খাদ্যসংকটও তৈরি হয়েছে। এতে পদ্মার বিভিন্ন দেশি মাছের প্রজাতি এখন অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে।
শুধু ইলিশ নয়, হারিয়ে যাচ্ছে দেশি মাছও
পদ্মার সংকটকে শুধু ইলিশের সংকট হিসেবে দেখলে বাস্তব পরিস্থিতির পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। নদীর পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণে বিভিন্ন দেশি মাছের প্রজাতিও বিপন্ন হয়ে পড়ছে।
একসময় পদ্মায় প্রচুর পরিমাণে ট্যাংড়া, পুঁটি, বোয়াল, আইড়সহ বিভিন্ন প্রজাতির দেশি মাছ পাওয়া যেত। এখন অনেক প্রজাতির মাছ আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে। কিছু প্রজাতি নির্দিষ্ট মৌসুম ছাড়া প্রায় দেখাই যায় না।
নদীর গভীরতা কমে যাওয়া, পানির প্রবাহের পরিবর্তন, প্রজননক্ষেত্র নষ্ট হওয়া এবং দূষণের পাশাপাশি অবৈধ ও ক্ষতিকর জাল ব্যবহারের কারণেও মাছের প্রজনন ও বংশবিস্তার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি নদীর পরিবেশে কোনো একটি মাছের সংখ্যা কমে যাওয়া শুধু ওই প্রজাতির জন্য সমস্যা নয়। এর সঙ্গে পুরো জলজ প্রতিবেশব্যবস্থা জড়িত। একটি প্রজাতির সংখ্যা কমলে খাদ্যশৃঙ্খলের অন্য স্তরেও এর প্রভাব পড়ে। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব নদীর সামগ্রিক জীববৈচিত্র্যের ওপর পড়ে।
ইলিশের পথ রুদ্ধ হয়েছে
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ইয়ামিন হোসাইন ইলিশের প্রজনন মৌসুম নিয়ে গবেষণা করেছেন। তাঁর মতে, ইলিশ দ্রুত সাঁতার কাটতে পারে এবং উজানের দিকে যেতে পছন্দ করে। সাধারণত ঝাঁকে ঝাঁকে চলাচল করে এই মাছ।
তাঁর গবেষণা ও ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তান আমলেও বঙ্গোপসাগর থেকে ইলিশ উজানে উঠে রাজশাহী হয়ে ভারতের ভাগলপুর পর্যন্ত যেত এবং সেখানে ডিম ছাড়ত। কিন্তু ফারাক্কা বাঁধ চালুর পর রাজশাহী অঞ্চলে ইলিশের উপস্থিতি ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে।
এর ফলে শুধু ইলিশ আহরণ কমেনি, নদীর সঙ্গে মানুষের দীর্ঘদিনের সম্পর্কেও পরিবর্তন এসেছে। যেসব জেলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম পদ্মার ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করেছেন, তাঁদের অনেকেই এখন বিকল্প পেশার কথা ভাবতে বাধ্য হচ্ছেন।
জেলেদের জালে নেই আগের সেই ইলিশ
চারঘাট উপজেলার জেলে শ্রী রামের অভিজ্ঞতাও নদীর পরিবর্তিত পরিস্থিতিরই প্রতিচ্ছবি। তাঁর ভাষ্য, পদ্মায় এখন আগের মতো ইলিশ জালে ধরা পড়ে না। কখনো অল্পসংখ্যক ইলিশ পাওয়া গেলেও সেগুলোর আকার ছোট।
তিনি বলেন, মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার কিছুদিন পর কখনো কখনো অল্প মাছ পাওয়া যায়। এ সময় নদীতে নজরদারি আরও বাড়ানো প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
জেলেদের অভিযোগ, নদীতে বৈধভাবে মাছ ধরার পাশাপাশি কিছু অসাধু ব্যক্তি নিষিদ্ধ ও ক্ষতিকর জাল ব্যবহার করছেন। এসব জালে ছোট মাছসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ নির্বিচারে আটকা পড়ে। ফলে মাছ বড় হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না এবং প্রজননক্ষম হওয়ার আগেই অনেক মাছ নদী থেকে উঠে যাচ্ছে।
প্রশাসনের অভিযান, তবু সংকট কাটছে না
রাজশাহী জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, পদ্মায় বর্তমানে ছোট আকারের ইলিশ অল্প পরিমাণে পাওয়া যায়। এর পাশাপাশি ট্যাংড়া, পুঁটিসহ অন্যান্য ছোট মাছও পাওয়া যাচ্ছে।
তিনি জানান, পদ্মায় অবৈধ জালে মাছ শিকার বন্ধ করতে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে। জনবল সীমিত হলেও চায়না দুয়ারি জালের ব্যবহার বন্ধে জেলার বিভিন্ন হাট-বাজারে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু অভিযান চালিয়ে পদ্মার দীর্ঘমেয়াদি সংকট সমাধান করা সম্ভব নয়। নদীর পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করা, প্রজননক্ষেত্র সংরক্ষণ, মাছের অভয়াশ্রম তৈরি, দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং ক্ষতিকর জাল ব্যবহার বন্ধের পাশাপাশি নদীর স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ প্রয়োজন।
জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে নদী ব্যবস্থাপনাও জরুরি
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টিপাতের ধরন, তাপমাত্রা, নদীর পানিপ্রবাহ এবং জলজ পরিবেশে পরিবর্তন আসছে। এর প্রভাব মাছের প্রজনন, খাদ্যপ্রাপ্যতা ও চলাচলের ওপরও পড়ছে। তবে পদ্মার ক্ষেত্রে শুধু জলবায়ু পরিবর্তনকে দায়ী করলে সংকটের পুরো কারণ বোঝা যাবে না।
উজানে পানির প্রবাহ কমে যাওয়া, নদীর তলদেশে পলি ও বালু জমা, চর জেগে ওঠা, অপরিকল্পিত ড্রেজিং, কৃষিজমি থেকে রাসায়নিক দূষণ এবং অবৈধভাবে মাছ ধরার মতো মানবসৃষ্ট কারণগুলোও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পদ্মাকে একটি জীবন্ত প্রতিবেশব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করে এর ব্যবস্থাপনা করতে হবে। নদীর শুধু নাব্যতা ফিরিয়ে আনা নয়, একই সঙ্গে মাছের প্রজনন ও বিচরণের উপযোগী পরিবেশও নিশ্চিত করতে হবে।
পদ্মায় ইলিশ ফেরাতে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ
রাজশাহীর পদ্মায় ইলিশের সংকট এখন আর শুধু জেলেদের সমস্যা নয়। এটি নদীর পরিবেশগত ভারসাম্য, জীববৈচিত্র্য এবং স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।
একসময় যে পদ্মা ইলিশের জন্য পরিচিত ছিল, সেই নদীতে আজ ইলিশের দেখা পাওয়াই কঠিন হয়ে পড়ছে। নদীর পানিপ্রবাহ ও গভীরতা কমে যাওয়া, চর ও বালুচর বৃদ্ধি এবং প্রজননক্ষেত্র সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে রাজশাহীর পদ্মা থেকে শুধু ইলিশ নয়, দেশি মাছের আরও বহু প্রজাতি হারিয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে সংকটে পড়বে নদীকেন্দ্রিক মানুষের জীবন-জীবিকা।
তাই পদ্মায় ইলিশ ফিরিয়ে আনতে হলে কেবল নির্দিষ্ট মৌসুমে মাছ ধরা বন্ধ বা অভিযান পরিচালনা করাই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন উজান থেকে পর্যাপ্ত পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করা, নদীর স্বাভাবিক নাব্যতা ও গভীরতা বজায় রাখা, মাছের প্রজননক্ষেত্র রক্ষা, দূষণ নিয়ন্ত্রণ, ক্ষতিকর জাল বন্ধ এবং বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে নদী ব্যবস্থাপনা।
পদ্মার পানি, স্রোত ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা গেলে হয়তো আবারও এই নদীতে ফিরতে পারে হারিয়ে যাওয়া ইলিশ। ফিরতে পারে জেলেদের মুখের হাসিও। অন্যথায় ইতিহাসে ইলিশের নদী হিসেবে পরিচিত পদ্মা একসময় শুধু স্মৃতিতেই থেকে যেতে পারে।














Discussion about this post