জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো একদিকে কার্বন নিঃসরণ কমানো, অন্যদিকে পরিবর্তিত জলবায়ুর সঙ্গে মানুষের জীবন ও অর্থনীতিকে খাপ খাইয়ে নেওয়া। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন, লবণাক্ততা, খরা ও তাপপ্রবাহের মতো দুর্যোগের মাত্রা ও ঝুঁকি কমাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পুরোপুরি বন্ধ করা বাংলাদেশের একার পক্ষে সম্ভব নয়। তবে দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমানো এবং মানুষের অভিযোজন সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব। এজন্য অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষা, কৃষি, পানি ব্যবস্থাপনা ও নগর পরিকল্পনায় বড় ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন।
প্রথমেই গুরুত্ব দিতে হবে নদী, খাল, জলাধার ও প্রাকৃতিক পানি প্রবাহ রক্ষায়। দখল ও ভরাটের কারণে অনেক এলাকায় পানি ধারণ ও নিষ্কাশনের স্বাভাবিক ব্যবস্থা নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে অতিবৃষ্টিতে দ্রুত জলাবদ্ধতা ও বন্যা তৈরি হচ্ছে। খাল-নদী পুনরুদ্ধার এবং দখলমুক্ত করার পাশাপাশি নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ জরুরি।
উপকূলীয় এলাকার সুরক্ষাও আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস থেকে মানুষকে রক্ষা করতে বাঁধের সক্ষমতা বাড়ানো, দুর্বল বাঁধ সংস্কার এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন প্রতিরক্ষা অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে। একই সঙ্গে উপকূলে ম্যানগ্রোভ বন ও সবুজ বেষ্টনী বাড়ানো গেলে ঝড়ের ক্ষতি কমাতে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে কৃষিতে। তাই কৃষকদের জন্য খরা, বন্যা ও লবণাক্ততা সহনশীল ফসলের জাত ছড়িয়ে দিতে হবে। পরিবর্তিত আবহাওয়ার সঙ্গে মিল রেখে ফসলের সময়সূচি নির্ধারণ, আধুনিক সেচব্যবস্থা, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং কৃষকদের কাছে নির্ভরযোগ্য আবহাওয়ার পূর্বাভাস পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থাও করতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় নগর পরিকল্পনায়ও পরিবর্তন জরুরি। শহরে গাছপালা, পার্ক, মাঠ ও জলাধার সংরক্ষণ করতে হবে। ভবন নির্মাণে পরিবেশবান্ধব নকশা এবং পর্যাপ্ত খোলা জায়গা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে অতিরিক্ত কংক্রিটের বিস্তার নিয়ন্ত্রণ না করলে শহরগুলোতে তাপমাত্রার চাপ আরও বাড়তে পারে।
কার্বন নিঃসরণ কমাতেও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প খাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো, জ্বালানির দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং দূষণকারী শিল্পকারখানার ওপর পরিবেশগত বিধিনিষেধ কার্যকর করতে হবে। পরিবহন খাতেও গণপরিবহন উন্নত করা এবং পরিবেশবান্ধব যানবাহনের ব্যবহার বাড়ানোর ওপর জোর দিতে হবে।
একই সঙ্গে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনতে হবে। খোলা জায়গায় বর্জ্য পোড়ানো বন্ধ, বর্জ্য পৃথকীকরণ, পুনর্ব্যবহার এবং আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালু করা গেলে পরিবেশ দূষণ কমানোর পাশাপাশি গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণও কমানো সম্ভব।
দুর্যোগের আগে প্রস্তুতিও বাড়াতে হবে। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও তাপপ্রবাহের আগাম সতর্কবার্তা দ্রুত স্থানীয় মানুষের কাছে পৌঁছানো, আশ্রয়কেন্দ্রের সক্ষমতা বাড়ানো এবং দুর্যোগের সময় জরুরি স্বাস্থ্য ও খাদ্য সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যারা ঘরবাড়ি ও জীবিকা হারিয়ে অন্য এলাকায় চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন, তাদের জন্যও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। নদীভাঙন ও লবণাক্ততায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসন, বিকল্প কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত না করলে জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতি ভবিষ্যতে বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট তৈরি করতে পারে।
তবে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জলবায়ু তহবিলের সঠিক ব্যবহার ও জবাবদিহি। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় যেসব প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে, সেগুলোর বাস্তবায়ন, ব্যয় ও ফলাফল নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণে কোনো প্রকল্প ব্যর্থ হলে এর সরাসরি মূল্য দিতে হয় দুর্যোগপ্রবণ এলাকার মানুষকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের মতো ঝুঁকিপূর্ণ দেশের জন্য জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় শুধু দেশীয় উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। জলবায়ু পরিবর্তনে ঐতিহাসিকভাবে বেশি দায়ী উন্নত দেশগুলোর কাছ থেকে জলবায়ু অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সহায়তা আদায়েও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে হবে।
সব মিলিয়ে জলবায়ুর প্রভাব কমাতে তাৎক্ষণিক ত্রাণের পাশাপাশি প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি। নদী-খাল রক্ষা, উপকূলীয় বাঁধ শক্তিশালী করা, কৃষিকে জলবায়ু সহনশীল করা, শহরের সবুজ ও জলাধার সংরক্ষণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি বাড়ানো এবং দুর্যোগের আগাম সতর্কতা জোরদার—এসব উদ্যোগ একসঙ্গে বাস্তবায়ন করতে পারলেই জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।














Discussion about this post