ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিএনপির নেতাকর্মীদের মেজাজ বেশ ফুরফুরে ছিল। তবে পরে দলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ ওঠে। এ কারণে দল থেকে সাংগঠনিক অভিযানে বিভিন্ন পর্যায়ের প্রায় সাত হাজার নেতাকর্মীকে বহিষ্কার করা হয়। কিন্তু এখন জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে বহিষ্কৃত নেতাদের অনেককেই আবার দলে ফিরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
দলীয় সূত্র জানায়, বিভিন্ন সময়ে বহিষ্কৃত অনেক নেতা দলে ফিরতে আবেদন করেছেন। ধীরে ধীরে এসব আবেদন যাচাই-বাছাই করে এবং তৃণমূলে কর্মীদের পুনরুজ্জীবিত করার প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নিয়ে তাদের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হচ্ছে। আগামী কিছুদিনের মধ্যে বহিষ্কৃত এসব নেতাদের বড় অংশকেই দলে ফিরিয়ে নেওয়া হবে।
বিএনপির একাধিক সূত্র জানিয়েছে, গত জুলাই মাসের অভ্যুত্থানের পর দলের প্রায় সাত হাজার নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, অসদাচরণ ও শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তাদের অনেককে বহিষ্কার করা হয়, কারও পদ স্থগিত রাখা হয়। এখন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে বহিষ্কৃতদের মধ্য থেকে ‘আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ও মাঠপর্যায়ে প্রভাবশালী’ নেতাদের দলে ফেরানোর উদ্যোগ নিয়েছে দলীয় হাইকমান্ড।
সম্প্রতি নির্বাচন সামনে রেখে দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়ার মধ্যে এ কার্যক্রম শুরু হয়। গত ৩ নভেম্বর ২৩৭ আসনে দলের সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকা ঘোষণার পর এ কার্যক্রম আরও জোরালো করেছে দলটি। গত কয়েকদিনে তৃণমূলের ৬০ জনের মতো নেতার বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হয়, সর্বশেষ গতকাল রোববার ৪০ নেতার পদ ফিরিয়ে দিয়েছে বিএনপি। মূলত নির্বাচনে ধানের শীষের প্রার্থীদের হাত সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করতে তাদের পরামর্শ ও অনুরোধ বিবেচনায় নিয়ে ‘আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় এবং মাঠপর্যায়ে প্রভাবশালী’ নেতাদের দলে ফেরানোর কার্যক্রমে গতি আনা হচ্ছে। আগামী কিছুদিনের মধ্যে বহিষ্কৃত নেতার বড় অংশকেই দলে ফিরিয়ে নেওয়া হতে পারে।
বিএনপির নেতাদের ভাষ্য, আগামী জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে মাঠে শক্তি পুনর্গঠনের অংশ হিসেবেই এ পুনর্বহাল প্রক্রিয়া। দীর্ঘদিন পর দলে ফেরার সুযোগ পাওয়ায় পুরোনো নেতাকর্মীরা আবারও সংগঠনের কাজে যুক্ত হচ্ছেন। ফলে তৃণমূলে সংগঠন শক্তিশালী হচ্ছে। এতে করে দলীয় প্রার্থীর বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনাও বাড়ছে।
দলটির দায়িত্বশীল একাধিক নেতা বলেন, নানা সময় বহিষ্কৃত হওয়া নেতাদের ধাপে ধাপে দলে ফেরানো হচ্ছে, এটা রাজনৈতিক বাস্তবতা। বিভিন্ন কারণে যাদের বাদ দেওয়া হয়েছিল, তারাও বিএনপিরই সন্তান। নির্বাচনে সবাইকে ‘এক ছাতার নিচে’ আনা এখন অগ্রাধিকার।
এদিকে বহিষ্কৃত হওয়ার পর অধিকাংশ নেতা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়লেও কিছু নেতা নিজেদের সক্রিয় রাখেন। তাদের মধ্যে খুলনার নজরুল ইসলাম মঞ্জু অন্যতম। খুলনা জেলা ও মহানগর কমিটি গঠন নিয়ে দলের সিদ্ধান্তে আপত্তি তোলায় মঞ্জুকে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে বিএনপির খুলনা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। তার জায়গায় ভারপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব দেওয়া হয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক অনিন্দ্য ইসলাম অমিতকে। তবে দলীয় পদ হারানোর পরও রাজনীতি থেকে সরে যাননি নজরুল ইসলাম মঞ্জু। বিভিন্ন ব্যানারে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে গেছেন, কেন্দ্রীয় কর্মসূচি পালন করেছেন তার অনুসারীদের নিয়ে। খুলনায় বিভিন্ন সমাবেশ, শোভাযাত্রা ও সামাজিক আয়োজনে তার সক্রিয় উপস্থিতি ছিল নিয়মিত।
অবশ্য দলে ফিরতে মঞ্জু একাধিকবার আবেদন করলেও এর আগে কেন্দ্র থেকে কোনো ইতিবাচক সাড়া মেলেনি। তবে সম্প্রতি কেন্দ্র থেকে ডাক পড়েছিল তার। নির্বাচন সামনে রেখে গত মাসের শেষদিকে দশ সাংগঠনিক বিভাগের দলের মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সঙ্গে ঢাকায় ভার্চুয়ালি মতবিনিময় করেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের নির্দেশনায় ওই মতবিনিময় সভায় উপস্থিত হন মঞ্জু। চার বছর পর ওই বৈঠকের মাধ্যমে তিনি দলে সক্রিয়ভাবে ফেরেন। পরবর্তী সমেয় গত ৩ নভেম্বর ঘোষিত প্রার্থী তালিকায় খুলনা-২ আসন থেকে দলীয় মনোনয়ন পান নজরুল ইসলাম মঞ্জু।
বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, শিগগির অব্যাহতিপ্রাপ্ত মঞ্জুকে আবার দলে ফিরিয়ে নেওয়া হতে পারে। সেক্ষেত্রে মঞ্জু দলের খুলনা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদকের পদেও পুনর্বহাল হবেন বলে তার অনুসারী কর্মী-সমর্থকদের প্রত্যাশা।
অন্যদিকে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে ২০২২ সালের মে মাসে কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র মনিরুল হক সাক্কুকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার করেছিল বিএনপি। তিনিও দল থেকে দূরে না সরে দলের সব কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন। কুমিল্লার রাজনীতিতে এখনো তাকে গুরুত্বপূর্ণ ‘ফ্যাক্টর’ বলে মনে করেন স্থানীয় অনেকে। সম্প্রতি সাক্কুকেও গুলশানে নিজ বাসায় ডেকে পাঠান বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তাকে আগামী নির্বাচনে কুমিল্লা সদর আসনে দল মনোনীত প্রার্থীর পক্ষে কাজ করার কথা বলা হয়েছে বলে জানা গেছে।
সম্প্রতি বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবীর রিজভীর সই করা এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, চট্টগ্রাম উত্তর জেলার বারইয়ারহাট পৌর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক দিদারুল আলম মিয়াজী ও সৈয়দপুর জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. রিয়াদ আরফান সরকার রানার বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করে তাদের প্রাথমিক সদস্য পদ পুনর্বহাল করা হয়েছে।
একইভাবে শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে বহিষ্কৃত আরও সাত নেতার বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করে পদ ফিরিয়ে দেওয়া হয়। তারা হলেন- ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক ফখর উদ্দিন আহমেদ বাচ্চু, গাজীপুর মহানগর বিএনপির সাবেক সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক রাকিবুল উদ্দিন সরকার পাপ্পু, চট্টগ্রাম উত্তর জেলার সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক নুরুল আমিন চেয়ারম্যান, পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক রুহুল আমিন দুলাল, নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ফাহমিদ ফয়সাল চৌধুরী এবং রংপুর জেলার সাবেক সদস্য মোকাররম হোসেন সুজন ও মো. আলি সরকার।
এ ইউ/














Discussion about this post