নারী পুরুষ কম বেশি সবার চুল পড়ার সমস্যা দেখা যায়। তবে অনেক সময় দেখা যায় পুরুষদের মাথার তালুর চুল খুব পাতলা হয়ে যায়, যেটা এক সময় টাকে পরিণত হয়। আর এই সমস্যার মূল কারণ অ্যান্ড্রোজেনেটিক অ্যালোপেশিয়া বা মেল প্যাটার্ন বল্ডনেস। বর্তমানে অনেকের এই সমস্যা দেখা যায়। চিকিৎসকদের মতে জেনেটিক কারণ ছাড়াও ধূমপান, দূষণ, স্ট্রেস এবং পুষ্টির ঘাটতির মতো আধুনিক জীবনধারার প্রভাব এর গতি বাড়িয়ে দিচ্ছে। তবে চিকিৎসকরা বলছেন শুরুতে লক্ষণ বুঝতে পারলে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব।
পুরুষদের টাক পড়ার কারণ:
মেল প্যাটার্ন বল্ডনেস হলো এক ধরণের বংশগত, অ্যান্ড্রোজেন-নির্ভর প্রক্রিয়া। টেস্টোস্টেরন থেকে ৫-আলফা রিডাক্টেস এনজাইমের মাধ্যমে তৈরি হয় ডাইহাইড্রোটেস্টোস্টেরন (ডিএইচটি), যা যা চুলের ফলিকলকে ছোট করে এবং চুলের বৃদ্ধির সময় কমিয়ে দেয়। জেনেটিক সংবেদনশীলতা নির্ধারণ করে কার ফলিকল কতটা ডাইহাইড্রোটেস্টোস্টেরন প্রবণ হবে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর প্রবণতাও বাড়ে। দেখা যায় ৩০–৫০ বছরে এটি সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।
প্রাথমমিক লক্ষণ: চিকিৎসকরা কয়েকটি প্রাথমিক লক্ষণগুলো দেখলে সাবধান হতে বলেছেন। লক্ষণগুলো হলো:
কপালের দুপাশ থেকে চুল পিছিয়ে গিয়ে ইংরেজি ‘এম’ আকৃতির হেয়ারলাইন তৈরি হওয়া।
মাথার চালুতে পাতলা হওয়া বা গর্তের মতো জায়গা তৈরি হওয়া।
চিরুনি বা গোসলের সময় স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি চুল পড়া।
চুল পড়ার পরে ধীরে পুনরায় চুল গজানো।
চিকিৎসকেরা সাধারণত নরউড-হ্যামিল্টন স্কালের ব্যবহার করে চুল পড়ার স্তর নির্ধারণ করেন। প্রথম চিকিৎসা শুরু করলে সবচেয়ে ভালো ফল পাওয়া যায়। যদি আপনি ৩ থেকে ৬ মাসেরও বেশি সময় ধরে প্যাটার্নযুক্ত পাতলাভাব লক্ষ্য করেন, তাহলে একজন চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যান।
টাক পড়া বাড়িয়ে দিতে পারে যে সব ঝুঁকি
- পারিবারিক ইতিহাস
বয়স
ধূমপান—অক্সিডেটিভ স্ট্রেস ও মাইক্রোভাসকুলার ক্ষতির কারণে চুলের মান দ্রুত খারাপ হয়
স্ক্যাল্প ইনফ্ল্যামেশন/খুশকি/সংক্রমণ
স্ট্রেস, কম ঘুম, পুষ্টির ঘাটতি। বিশেষ করে ভিটামিন ডি, বি ১২ এবং আয়রন
থাইরয়েড সমস্যা বা কিছু ওষুধও চুল পড়া বাড়াতে পারে
প্রমাণ-ভিত্তিক যে চিকিৎসাগুলো কার্যকর
চিকিৎসা অবশ্যই ডাক্তারকে দেখিয়ে শুরু করতে হবে।
চিকিৎসা: টাক পড়া প্রতিরোধে বিভিন্ন চিকিৎসা রয়েছে। তবে সব চিকিৎসা যে কাজে দেয় এমন নয়। পুরুষদের টাক সমস্যা নিয়ন্ত্রণে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞরা যেসব চিকিৎসা সাধারণত পরামর্শ দেন, সেগুলোর সংক্ষিপ্ত বিবরণ নিচে দেয়া হলো। মনে রাখবেন এই চিকিৎসাগুলো শুধু চিকিৎসকের পরামর্শে শুরু করা উচিত।
টপিক্যাল মিনোক্সিডিল (২%-৫%): এটি একটি এফডিএ-অনুমোদিত ওষুধ, যা চুলের বৃদ্ধি পর্যায় দীর্ঘায়িত করে এবং নিয়মিত ব্যবহারে চুলের ঘনত্ব বাড়ায়। দৃশ্যমান পরিবর্তন সাধারণত ৩–৬ মাসে দেখা যায় এবং ফল বজায় রাখতে নিয়মিত ব্যবহার প্রয়োজন। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে মিনোক্সিডিল ও টপিক্যাল ফিনাস্টেরাইডের সমন্বিত প্রয়োগ চুলের ঘনত্ব আরও বাড়াতে সাহায্য করতে পারে।
ওরাল ফিনাস্টেরাইড (১ এমজি/দিন): এটি একটি সিস্টেমিক ৫-আলফা রিডাক্টেজ ইনহিবিটার, যা মাথার ত্বকে ডিএইচটির পরিমাণ কমিয়ে চুল পড়া থামাতে এবং নতুন চুল গজাতে সহায়তা করে। কিছু মানুষের ক্ষেত্রে যৌনসংক্রান্ত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে, যা চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করা উচিত। ফল স্থায়ী রাখতে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহার প্রয়োজন হয়।
ওরাল মিনোক্সিডিল ও সমন্বিত নিয়ম: নতুন এই পদ্ধতিতে বেশ ভালো ফলাফল দেখা যাচ্ছে। তবে এই চিকিৎসার দীর্ঘমেয়াদি তথ্য সীমিত তাই বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে ব্যবহার জরুরি।
হেয়ার ট্রান্সপ্লান্ট সার্জারি: স্ট্রিপ পদ্ধতিতে স্থায়ীভাবে চুল প্রতিস্থাপন করা যায়। তবে রোগীর সঠিক নির্বাচন, চুল পড়া স্থিতিশীল হওয়া, ডোনার সাইটের ঘনত্ব এবং প্রত্যাশা নিয়ে অভিজ্ঞ সার্জনের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ।
সহায়ক বিকল্প: প্লাজমা থেরাপি, লো-লেভেল লেজার থেরাপি ও নিউট্রাসিউটিক্যালস কিছু ক্ষেত্রে সহায়ক হিসেবে কাজ করতে পারে। তবে এগুলো প্রমাণিত ওষুধের বিকল্প নয়। সাম্প্রতিক গবেষণায় নতুন ওষুধ এবং এমনকি কিছু খাদ্যগত পদ্ধতি নিয়েও অনুসন্ধান চলছে।
টাক পড়া প্রতিরোধে করণীয়
- চুল পাতলা লাগলে তাড়াতাড়ি একজন চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যান;
প্রমাণিত চিকিৎসা (মিনোক্সিডিল/ফিনাস্টেরাইড) চিকিৎসকের পরামর্শে শুরু করুন;
ধূমপান ছাড়ুন;
স্ট্রেস, ঘুমের অভাব ও খারাপ খাদ্যাভ্যাস ঠিক করুন;
প্রয়োজন হলে আয়রন, বি১২, ভিটামিন ডি, থাইরয়েড টেস্ট করান;
“মিরাকল” ট্রিটমেন্ট বা হোম রেমেডির ওপর নির্ভর করবেন না;
হেয়ার ট্রান্সপ্লান্ট করতে চাইলে কমপক্ষে ১২–১৮ মাস ওষুধে চুল পড়া স্থিতিশীল হওয়ার জন্য অপেক্ষা করুন।
পুরুষদের চুল পড়া সাধারণ এবং পূর্বানুমানযোগ্য হলেও এর গতি ও প্রভাব অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা যায়। জেনেটিক্স ও হরমোন মূল কারণ হলেও জীবনযাপনের অভ্যাস এটিকে আরও ত্বরান্বিত করে। প্রাথমিক লক্ষণ চিনে বুঝতে পারলে শুরুতে চিকিৎসা নিলে ভালো ফল মিলে। সেই সঙ্গে স্বাস্থ্যকর জীবনধারা মেলে চললেও চুল পড়া প্রতিরোধ করা যায়। তবে যদি চুল নিয়মিত পড়ে আর বুঝতে পারেন এটা টাক পড়ার দিকে যাছে তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেন।
সূত্র: এনডিটিভি














Discussion about this post