সব হারিয়েও বিশ্বকাপ ফুটবলের আনন্দ ছুঁয়ে দেখার চেষ্টা করছে গাজার বাসিন্দারা। যুদ্ধ তাদের সবকিছু কেড়ে নিতে পেরেছে, কিন্তু কেড়ে নিতে পারেনি ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা। ধ্বংসস্তূপের মাঝেই বিশ্বমঞ্চের খেলা দেখছে বাস্তুচ্যুত গাজাবাসী।
২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাসের হামলার পর গাজায় ইসরাইলের দুই বছরব্যাপী সামরিক অভিযানে গাজার বেশিরভাগ অংশ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি হওয়া সত্ত্বেও ইসরাইল গাজায় হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। এত কষ্টের মাঝেও খেলা দেখা, হাসা বা সাধারণ জীবনযাপনের চেষ্টা করা তাদের কাছে যেন এক ধরণের নীরব প্রতিরোধ।
মঙ্গলবার (১৬ জুন) এক প্রতিবেদনে গাজার ফুটবলপ্রেমিদের চিত্র তুলে ধরে সংবাদমাধ্যম রয়টার্স। যেখানে বলা হয়, গত শনিবার কাতার বনাম সুইজারল্যান্ডের মধ্যকার ম্যাচটি যখন শুরু হতে যাচ্ছিল, তখন ৩৮ বছর বয়সী আরাউই তার পুরনো ‘গাজা স্পোর্টস ক্লাব’-এর জার্সি এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় জেতা মেডেলগুলো পরে তৈরি হচ্ছিলেন। ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের কারণে বাস্তুচ্যুত গাজাবাসীদের জন্য আশ্রয়শিবিরে পরিণত হওয়া একটি স্কুলের অন্ধকার ঘরে বসে ল্যাপটপের আলোয় বন্ধুদের নিয়ে খেলা দেখার চেষ্টা করছিলেন তিনি।
গাজা সিটির ‘রয়্যাল ক্যাফে’-র মালিক আলা বাবিল। তিনি তার ক্যাফেতে দুটি বিকল্প বিদ্যুৎ লাইন এবং একটি ব্যাকআপ ব্যাটারির ব্যবস্থা করেছেন। মধ্যরাতের পর যখন জ্বালানি চালিত জেনারেটরগুলো বন্ধ হয়ে যায়, তখনও যেন গভীর রাতের ম্যাচগুলো নির্বিঘ্নে দেখানো যায়, সেজন্যই তার এই আপ্রাণ চেষ্টা।
বিশ্বকাপ বা যেকোনো আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে যখন মরক্কো, মিশর, আলজেরিয়া বা তিউনিসিয়ার মতো কোনো আরব দেশ খেলে, তখন গাজাবাসীদের উদ্দীপনা বহুগুণ বেড়ে যায়। শুধু খেলা দেখাই নয়, গাজার বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে ধ্বংসস্তূপের মাঝেই ছোট ছোট ফুটবল টুর্নামেন্টের আয়োজন করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সাহায্য সংস্থা ও স্থানীয় ভলান্টিয়াররা শিশুদের মানসিক চাপ কমাতে খেলার ব্যবস্থা করে দিচ্ছেন। ধ্বংসস্তূপের মাঝেই শিশুদের ফুটবল খেলার এই দৃশ্য নজর কাড়ছে বিশ্ববাসীর।
রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ফিলিস্তিনি ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের মিডিয়া অফিসার মুস্তাফা সিয়াম বলেন, “ফিলিস্তিনিদের খেলাধুলাকে প্রধান লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে ইসরাইলি সামরিক বাহিনী। গাজার ক্রীড়া অবকাঠামো এবং ক্রীড়াবিদদের ওপর হামলা চালানো হয়েছে। এবারের যুদ্ধটি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে সবচেয়ে তীব্র, ভয়াবহ এবং দীর্ঘস্থায়ী। আমরা এমন এক ধ্বংসযজ্ঞের কথা বলছি যেখানে বড়-ছোট স্টেডিয়াম, ক্লাব, ইনডোর হল এবং স্পোর্টস একাডেমিসহ প্রায় ২৮৫টি ক্রীড়া অবকাঠামোকে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। সেই সাথে আমাদের এক হাজারেরও বেশি অ্যাথলেট ও ক্রীড়াবিদ শাহাদাত বরণ করেছেন।”
ফিলিস্তিনি ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যমতে, ২০২৩ সাল থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধে ইসরায়েলের হামলায় নিহত ৭৩,০০০ ফিলিস্তিনির মধ্যে প্রায় ১,০০০ জন ক্রীড়াবিদ ছিলেন। তাদের মধ্যে শিশু ও অপেশাদার খেলোয়াড় থেকে শুরু করে রেফারি ও পেশাদার অ্যাথলেটও রয়েছেন।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, যখন মানুষ দীর্ঘসময় ধরে তীব্র আতঙ্ক এবং ট্রমার মধ্যে থাকে, তখন মস্তিষ্ক একটু স্বস্তির জন্য ‘এসকেপিজম’ বা সাময়িক মুক্তির পথ খোঁজে। ফুটবল ম্যাচ দেখা গাজার মানুষের জন্য ঠিক তেমনই একটি মাধ্যম। বোমা, ড্রোন আর ক্ষুধার নির্মম বাস্তবতাকে ভুলে গিয়ে ৯০ মিনিটের জন্য হলেও এক চেনা দুনিয়ায় হারিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে ফুটবল বিশ্বকাপ।
এম এইচ/














Discussion about this post