একটা সমাজ যখন অসভ্যতার দিকে এগোতে থাকে তখন ওই সমাজ থেকে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হতে থাকে। ছিনতাই চাঁদাবাজি টেন্ডারবাজি দিয়ে শুরু করা অপরাধকারীরা আরও বড় অন্যায়ের দিকে এগুতে থাকে। একসময় সব অন্যায় আর অপরাধকে পেছনে ফেলে সভ্যতা ও মানবতাবর্জিত অপরাধের চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে যায়। তখন অপরাধীরা হয়ে ওঠে বেপরোয়া। শুরু হয় নিরপরাধ মানুষ হত্যা।
পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অন্যায়গুলোর অন্যতম অন্যায় হলো নিরাপরাধ মানুষকে হত্যা করা। যারা ক্ষমতা কিংবা অন্য কোনো দাপটের কারণে নিরপরাধ মানুষ মারে তারা আর মানুষ থাকে না। তাবৎ পৃথিবীর মানুষ তাদের ধিক্কার জানায়। শুধু সভ্য সমাজ নয়, পৃথিবীর কোনো ধর্মে, সমাজে ও মতবাদে নিরাপরাধ মানুষ মারার কোনো বিধান নেই। এক্ষেত্রে ইসলাম সবচেয়ে কঠোর। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘যে নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করল সে যেন পুরো পৃথিবীকে হত্যা করল, আর যে একজন (নিরপরাধ) মানুষকে বাঁচিয়ে দিল সে যেন পুরো পৃথিবীকে হত্যার হাত থেকে বাঁচিয়ে দিল (সুরা মায়েদাহ, আয়াত : ৩২)
হাদিসে এসেছে- ‘আল্লাহ দুনিয়া ধ্বংস হওয়া সয়ে যাবেন, তবে একজন নিরপরাধ মুসলমান হত্যা সহ্য করবেন না’ (তিরমিজি, হাদিস : ১৩৯৫)
হাদিসের বিখ্যাত কিতাব তিরমিজির একটি বর্ণনা এরকম- দুনিয়া ধ্বংস করার চেয়েও বড় অপরাধ হলো নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা। আল্লাহর কাছে ঘৃণিত কাজ হলো মানুষ হত্যা করা।
ইসলাম মানুষকে নিরাপদে রাখার ব্যাপারে খুবই সতর্কতার তাগিদ দিয়েছে। কোনো অবস্থাতেই নিরপরাধীকে অপরাধী করার সুযোগ ইসলামে নেই। শুধু হত্যা নয়- অপহরণ ও গুম প্রভৃতি চরমপন্থা অবলম্বন মৌলিকভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আগেকার জাতিগুলো এসব অন্যায়ের কারণেই ধ্বংস হয়ে গেছে। সাময়িক উত্তেজনা বা সস্তা আবেগের বশবর্তী হয়ে মানুষকে অপহরণ, গুম, খুন, গুপ্তহত্যা, যাত্রীবাহী বাসে অগ্নিসংযোগ, জ্বলন্ত পুড়িয়ে মারা ইত্যাদির অবকাশ ইসলামে নেই। কাউকে প্রাণনাশ বা হত্যা করাকে ইসলাম সামাজিক অনাচার ও অত্যাচারের অন্তর্ভুক্ত করেছে। যারা হালকা ছুঁতোয় নিরপরাধ মানুষ হত্যাকান্ডে লিপ্ত হয়, তারা মানবতাবর্জিত ও সভ্য জগতের শত্রু। পবিত্র কোরআনে নরহত্যাকে চিরতরে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে- ‘আল্লাহ যে প্রাণকে মর্যাদা দান করেছেন, যথার্থ কারণ ব্যতিরেকে তোমরা তাকে হত্যা করো না।’ যাকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা হয়, আমি তার অলিকে (পরিবার) কিসাস (রক্তপণ) দিয়েছি। সুতরাং সে যেন হত্যাকান্ডে সীমালঙ্ঘন না করে। নিশ্চয় সে এর উপযুক্ত যে, তার সাহায্য করা হবে। (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত : ৩৩)
নিরপরাধ মানুষ হত্যার শাস্তির কথা কোরআনে আল্লাহ বিশদভাবে বর্ণনা করে বলেন, ‘এটা কোনো মুসলিমের কাজ হতে পারে না যে, সে (ইচ্ছাকৃত) কোনো মুসলিমকে হত্যা করবে। ভুলবশত এরূপ হয়ে গেলে সেটা ভিন্ন কথা। যে ব্যক্তি কোনো মুসলিমকে ভুলবশত হত্যা করবে (তার ওপর ফরজ) একজন মুসলিম গোলামকে স্বাধীন করা এবং নিহতের ওয়ারিশদের দিয়াত (রক্তপণ) আদায় করা, অবশ্য তারা ক্ষমা করে দিলে ভিন্ন কথা। নিহত ব্যক্তি যদি তোমাদের শত্রু সম্প্রদায়ের লোক হয়, কিন্তু সে নিজে মুসলিম, তবে (কেবল একজন মুসলিম গোলামকে স্বাধীন করা, ফরজ দিয়াত বা রক্তপণ দিতে হবে না) নিহত ব্যক্তি যদি এমন সম্প্রদায়ের লোক হয় (যারা মুসলিম নয় বটে, কিন্তু) যাদের ও তোমাদের মধ্যে চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে, তবে (সেক্ষেত্রেরও তার ওয়ারিশদের রক্তপণ দেওয়া ও একজন মুসলিম গোলাম আজাদ করা (ফরজ)। অবশ্য কারও কাছে (গোলাম) না থাকলে, সে বিরতহীন দু’মাস রোজ রাখবে। এটা আল্লাহর দেওয়া তাওবার ব্যবস্থা। আল্লাহ সর্বজ্ঞ প্রজ্ঞাময়। যে ব্যক্তি কোনো মুসলিমকে জেনেশুনে হত্যা করবে, তার শাস্তি জাহান্নাম, যাতে সে সর্বদা থাকবে এবং আল্লাহ তার প্রতি গজব অবতীর্ণ করবেন ও তাকে অভিশাপ করবেন। আর আল্লাহর তার জন্য মাহাশাস্তির প্রস্তুত করে রেখেছেন।’ (সুরা আন নিসা, আয়াত : ৯২-৯৩)
কোরআনের অন্যস্থানে আরও বিশদ ও ব্যাপক আকারে বর্ণিত- ‘এবং আমি তাতে (তাওরাতে) তাদের জন্য বিধান লিখে দিয়েছিলাম যে, প্রাণের বদলে প্রাণ, চোখের বদলে চোখ, নাকের বদলে নাক, কানের বদলে কান ও দাঁতের বদলে দাঁত। আর জখমেও (অনুরূপ) বদলা নেওয়া হবে। অবশ্য যে ব্যক্তি তা (অর্থাৎ বদল) ক্ষমা করে দেবে, তার জন্য তা গুনাহের কাফফারা হয়ে যাবে। যারা আল্লাহর নাজিলকৃত বিধান অনুসারে বিচার করে না, তারা জালিম (সুরা মায়েদাহ, আয়াত : ৪৫)
নিরপরাধ কাউকে হত্যা ও গুপ্তহত্যা ইত্যাদির ব্যাপারে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে রাসুল (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ সবাইকে ক্ষমা করলেও নিরপরাধ মানুষ হত্যাকারীকে আল্লাহ কখনোই ক্ষমা করেন না। প্রকৃত কোনো মুসলমান অন্য মুসলমানকে হত্যা করতে পারে না।’ মহানবী (সা.) আরও বলেন, ‘কিয়ামতের দিন মানুষের মধ্যে সর্বপ্রথম যে মোকদ্দমার ফয়সালা হবে, তাহলো রক্তপাত (হত্যা) সম্পর্কিত।’ (তিরমিজি হাদিস : ১৪০৯)
আজকের এই সমাজকে বাঁচাতে এবং নিজে নিরাপদে থাকতে ইসলামের দিকনির্দেশনাগুলো মেনে চলা উচিত। অন্যকেও এসব ব্যাপারে সচেতন করা জরুরি। ধর্মীয় মূল্যবোধের অনুপস্থিতিই মানুষকে পশুত্বের কাতারে নামিয়ে দেয়।
এম এইচ/














Discussion about this post