আজ থেকে ঠিক তেরো বছর আগে ২০১৩ সালের এই দিনে (২৪ এপ্রিল) ধসে পড়েছিল সাভারের পোশাক কারখানা রানা প্লাজা। বাংলাদেশের ইতিহাসে ঘটে যাওয়া সবচেয়ে বড় এই শিল্প দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ১ হাজার ১৩৬ জন শ্রমিক। আহত হন আরও প্রায় দুই হাজার শ্রমিক।
ভবন ধসে বিপুলসংখ্যক মানুষ মারা যাওয়ার ঘটনায় ওই সময় ৬টি মামলা দায়ের করা হয়। তেরো বছর পার হলেও এখনো শেষ হয়নি এসব মামলার বিচার। কবে নাগাদ শেষ হবে তাও বলতে পারছেন না সংশ্লিষ্টরা।
সহস্রাধিক মানুষের মৃত্যুর ঘটনায় ‘অবহেলার কারণে মৃত্যু’ উল্লেখ করে হত্যা মামলা দায়ের করে পুলিশ; ইমারত নির্মাণ আইন না মেনে ভবন নির্মাণ করায় একটি মামলা করে রাজউক এবং ভবন নির্মাণে দুর্নীতি ও সম্পদের তথ্য গোপন সংক্রান্ত দুটি মামলা করে দুদক। এছাড়া অস্ত্র এবং বিশেষ ক্ষমতা আইনে দায়ের করা হয় আরও দুটি মামলা।
ছয়টি মামলার মধ্যে সম্পদের তথ্য গোপনের একটি মামলা কেবল নিষ্পত্তি হয়েছে। বাকি পাঁচটি মামলা এখনো ঝুলে আছে। আসামিপক্ষ বলছে, মামলাগুলো নিষ্পত্তি না হওয়ায় বিচারহীনভাবে কারাগারে আটক রয়েছেন ভবন মালিক সোহেল রানা। অন্যদিকে মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির আশা করছে রাষ্ট্রপক্ষ।
ইমারত আইনে রাজউকের মামলা
আইন না মেনে ভবন নির্মাণের অভিযোগে ওই সময় সোহেল রানাসহ ১৩ জনকে আসামি করে সাভার মডেল থানায় আরেকটি মামলা করেন রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের তৎকালীন (রাজউক) দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. হেলাল আহমেদ। ২০১৫ সালের ২৬ এপ্রিল সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার বিজয়কৃষ্ণ কর সোহেল রানাসহ ১৮ জনকে অভিযুক্ত করে ওই মামলায় আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। মামলার সাক্ষী করা হয় ১৩০ জনকে। ২০১৬ সালের ১৪ জুন ঢাকার তৎকালীন চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোস্তাফিজুর রহমান আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন। এদের মধ্যে আসামি ফ্যান্টম অ্যাপারেলস লিমিটেডের চেয়ারম্যান মুহাম্মদ আমিনুল ইসলামকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেন আদালত।
ভবন নির্মাণ সংক্রান্ত দুর্নীতির মামলা
রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পরপরই ভবন নির্মাণে দুর্নীতির অনুসন্ধানে নামে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অনুসন্ধানে দেখা যায়, রানা প্লাজা নির্মাণে ছয় তলার অনুমোদন থাকলেও আট তলা ভবন নির্মাণ করা হয়। এ কারণে ভবন নির্মাণ সংক্রান্ত দুর্নীতির অভিযোগে আরেকটি মামলা দায়ের করে দুদক। ২০১৪ সালের ১৬ জুলাই রানাসহ ১৮ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও দুদকের উপপরিচালক মফিদুল ইসলাম। বর্তমানে মামলাটি ঢাকার বিভাগীয় স্পেশাল জজ শারমিন আফরোজের আদালতে যুক্তিতর্ক শুনানির পর্যায়ে রয়েছে। এ মামলায় মোট ২০ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৯ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ করেছেন আদালত। গত এক বছর ধরে মামলাটি যুক্তিতর্ক শুনানির পর্যায়ে রয়েছে। সর্বশেষ গত ৩০ মার্চ অধিকতর যুক্তিতর্ক শুনানির জন্য দিন ধার্য থাকলেও তা হয়নি। আদালত পরবর্তী শুনানির জন্য আগামী ১৭ মে দিন নির্ধারণ করেছেন।
অস্ত্র আইন ও বিশেষ ক্ষমতা আইনের দুই মামলা
রানা প্লাজা ভবন ধসে পড়ার সপ্তাহ খানেক পর ঢাকা জেলা গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক শাহিন শাহ পারভেজ ধামরাই থানায় অস্ত্র আইন ও বিশেষ ক্ষমতা আইনে দুটি মামলা করেছিলেন। দুই মামলাতে সোহেল রানাকে একমাত্র আসামি করা হয়। বর্তমানে মামলাগুলো ঢাকার প্রথম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ এ.বি এম. আশফাক উল হকের আদালতে বিচারধীন রয়েছে। সবশেষ গত ৩০ মার্চ সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য দিন ধার্য থাকলেও সাক্ষীরা উপস্থিত হয়নি। এজন্য বিচারক পরবর্তী শুনানির জন্য আগামী ৩০ এপ্রিল দিন ধার্য করেছেন।
২০১৭ সালের ২৯ আগস্ট এ মামলার রায় ঘোষণা করেন ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৬-এর তৎকালীন বিচারক কে এম ইমরুল কায়েস। রায়ে সোহেল রানাকে তিন বছরের কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা এবং অনাদায়ে আরও তিন মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। একই মামলায় তার মা মর্জিনা বেগমকেও তিন বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। একইসঙ্গে অবৈধভাবে অর্জিত সাভার বাজার রোডের ৬৯/১ বাড়িটির এক-তৃতীয়াংশ রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করার আদেশ দেন আদালত।
এস আই/














Discussion about this post