রায়েরবাজার গণকবরে সোহেল রানার মরদেহ সনাক্তকরণ জবাবদিহিতার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
৫ জানুয়ারি ২০২৬ বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ফরেনসিক শাখা জুলাই ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের সময় নিহত সোহেল রানার মরদেহ সনাক্তকরণ আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করে। বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড এন্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) এই ঘটনার সত্য উদ্ঘাটন, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করছে।
মোঃ সোহেল রানাকে (৩৮) ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই ঢাকার যাত্রাবাড়ী থানাধীন দক্ষিণ কাজলা এলাকায় একটি শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে অংশগ্রহণের সময় জোরপূর্বক গুম করা হয়। পরবর্তীতে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয় এবং আনজুমান মফিদুল ইসলামের সহায়তায় রায়েরবাজার শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানের একটি গণকবরে অজ্ঞাতনামা হিসেবে দাফন করা হয়। কোনো কবরফলক বা চিহ্ন না থাকায় তার পরিবার দাফনের স্থান শনাক্ত করতে পারেনি কিংবা তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী দাফন কার্য সম্পন্ন করতে পারেনি, যা পরিবারটির ভোগান্তি ও মানসিক যন্ত্রণাকে আরও গভীর করে তোলে।
ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায় ভুক্তভোগীর ভাই মোঃ জুয়েল (৩৪) ইন্টারন্যাশনাল ট্রুথ অ্যান্ড জাস্টিস প্রজেক্ট (আইটিজেপি)-এর রেফারেলের মাধ্যমে ব্লাস্টের কাছে আইনি সহায়তা চান। এরপর ব্লাস্টের সহায়তায় ২০২৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর যাত্রাবাড়ী আমলি আদালতে দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ৩০২, ২০১ ও ৩৪ ধারায় একটি অভিযোগ দায়ের করা হয়, যেখানে ভুক্তভোগীর হত্যার বিচার দাবি করা হয় এবং একই সঙ্গে রায়েরবাজার কবরস্থান থেকে মরদেহ উত্তোলন ও ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে মরদেহ সনাক্তের আদেশ চাওয়া হয়। তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা দেখা দিলে, ২০২৫ সালের ৩০ জুলাই ব্লাস্ট আদালতে আবেদন করে যাতে সব অজ্ঞাতনামা মরদেহ উত্তোলন, ফরেনসিক ডিএনএ পরীক্ষা এবং আনুষ্ঠানিকভাবে পরিচয় সনাক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়। মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশক্রমে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ের ফরেনসিক বিশেষজ্ঞের অংশগ্রহণে সিআইডির উদ্যোগে ২০২৫ সালের ৭ থেকে ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত রায়েরবাজার কবরস্থানে মরদেহ উত্তোলন, ফরেনসিক পরীক্ষা এবং ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়।
ডিএনএ পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে সিআইডি জুলাই ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে নিহত আটজন ব্যক্তির পরিচয় নিশ্চিত করে, যার মধ্যে মোঃ সোহেল রানাও রয়েছেন। এর ফলে তার বাবা-মা ও ভাইবোনেরা অবশেষে তাঁর কবর শনাক্ত করতে সক্ষম হন এবং ১৮ মাসের দীর্ঘ মানসিক যন্ত্রণা ও অনিশ্চয়তার অবসান ঘটে। নিজের সন্তানের কবর শনাক্ত করার পর মোঃ সোহেল রানার মা রাশেদা বেগম কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, “এত দিন পর আমার সোহেলকে পাইছি, কোন জায়গায় বাদ রাখি নাই, কিন্তু তুই এখানে শুইয়া আছস, আমি তো জানি না। তোমরা আমারে সোহেলের কাছে মাটি দেও, আমি আমার সাহেলের কাছে থাকব।”
তার ছোট ভাই মোঃ আলভী নাবিল হোসেন বলেন, “আমরা গভীরভাবে কৃতজ্ঞ যে অবশেষে আমার ভাইয়ের শেষ বিশ্রামস্থল খুঁজে পেতে পেরেছি। ব্লাস্ট এবং ইন্টারন্যাশনাল ট্রুথ অ্যান্ড জাস্টিস প্রজেক্ট (আইটিজেপি)-এর ধারাবাহিক সহায়তা ছাড়া এটি সম্ভব হতো না।”
এই সনাক্তকরণ প্রক্রিয়া, যেখানে বিচারিক তদারকি, ফরেনসিক বিজ্ঞান এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সমন্বিত কার্যক্রম। এটি জোরপূর্বক গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড সংক্রান্ত মামলাগুলো মোকাবিলায় একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড অনুযায়ী জবাবদিহিতা ও প্রতিকার নিশ্চিত করতে স্বাধীন, বৈজ্ঞানিক এবং স্বচ্ছ তদন্তের গুরুত্ব তুলে ধরে।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট কাজী জাহেদ ইকবাল বলেন, “এটি দুইটি কারণে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ছিল। প্রথমত, যারা নিখোঁজ হয়েছিল তারা প্রকৃতপক্ষে নিহত হয়েছেন কি না এবং তাদের মৃত্যু কীভাবে হয়েছে তা নির্ধারণ করা জরুরি ছিল। এছাড়া মরদেহ ও কবর সনাক্ত করা শুধু পরিবারের মানসিক প্রশান্তির জন্যই নয়, সত্য উদ্ঘাটনের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। দ্বিতীয়ত, যথাযথ প্রমাণের অভাবে বিচার প্রক্রিয়ায় গুরুতর জটিলতার ঝুঁকি ছিল। মরদেহ সনাক্ত না হলে বিচার প্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারত। এ বিষয়ে রাষ্ট্রের উদ্যোগ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার পথে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ।”
ভুক্তভোগী পরিবারকে আইনি সহায়তা প্রদানকারী আইনজীবীদের একজন অ্যাডভোকেট সুশমিতা চক্রবর্তী বলেন,
“দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর আদালত ও সিআইডির সহায়তায় ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে মোঃ সোহেল রানার পরিচয় নিশ্চিত হয়েছে, এর জন্য আমি কৃতজ্ঞ। তবে এটি যদি আগে করা হতো, তাহলে পরিবারটি যথাযথ মর্যাদার সঙ্গে বিদায় জানাতে পারত। অজ্ঞাতনামা মরদেহের ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক দাফন বা গণদাফনের পরিবর্তে মরদেহ সঠিকভাবে সনাক্ত ও সংরক্ষণ নিশ্চিত করার জন্য সুস্পষ্ট ও কার্যকর নির্দেশিকা থাকা অত্যন্ত জরুরি।”
এই প্রেক্ষাপটে ব্লাস্ট সরকারকে জরুরি ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানাচ্ছে, যাতে জুলাই ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের সকল ভুক্তভোগীর পরিচয় নিশ্চিত করা হয়; বেআইনি হত্যাকাণ্ড ও জোরপূর্বক গুমের জন্য দায়ীদের সুষ্ঠু বিচারের মাধ্যমে শনাক্ত ও বিচার নিশ্চিত করা হয়; এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন এবং মানসিক সহায়তাসহ যথাযথ প্রতিকার প্রদান করা হয়।
এই মামলায় ব্লাস্টের পক্ষে যুক্ত ছিলেন অ্যাডভোকেট মোঃ মশিউর রহমান, অ্যাডভোকেট মোঃ রবিউল ইসলাম রবি, অ্যাডভোকেট বরকত আলী এবং অ্যাডভোকেট সুশমিতা চক্রবর্তী। মামলাটিতে পরামর্শ প্রদান করেন অ্যাডভোকেট কাজী জাহেদ ইকবাল এবং ব্যারিস্টার প্রিয়া আহসান চৌধুরী।
এম এইচ/














Discussion about this post