২০০২ সাল থেকে পবিত্র কাবার কিসওয়ায় (গিলাফ) কোরআনের আয়াত লিখছেন মুখতার আলম শাকদার। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এই ক্যালিগ্রাফার বর্তমানে সৌদি আরবের নাগরিকত্ব লাভ করেছেন।
মুখতার আলম শাকদার জমাদিউল আউয়াল ১৪২৩ হিজরি (জুলাই ২০০২) থেকে মক্কার কিসওয়া কারখানায় কাবার গিলাফের প্রধান ক্যালিগ্রাফার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
সৌদি আরবে এক বাংলাদেশি পরিবারে জন্মগ্রহণকারী এই গুণী শিল্পীকে দক্ষ ও যোগ্য বিদেশি নাগরিকদের সম্মান জানানোর এক রাজকীয় ডিক্রির অধীনে সৌদি নাগরিকত্ব দেয়া হয়। তিনি শেখ আব্দুল রহিম আমিন বুখারীর মূল ‘থুলুথ’ লিপি অক্ষুণ্ণ রেখেই অক্ষরের আকার, অনুপাত এবং আলংকারিক উপাদানের আধুনিকায়ন ও পরিমার্জন করেছেন।
মুখতার আলম শাকদার
প্রতি বছর লাখ লাখ হাজি মক্কার মাসজিদুল হারামে (গ্র্যান্ড মস্ক) কাবা শরিফ তাওয়াফ করেন এবং এর ওপর জড়ানো কালো কাপড়ের গিলাফটির (কিসওয়া) দিকে অপলক তাকিয়ে থাকেন, যা সোনা ও রুপার সুতোয় বোনা কুরআনের আয়াতে সুশোভিত। আর এই শব্দগুলোর পেছনের মূল নকশাকার হলেন মুখতার আলম শাকদার।
মুখতার আলম সৌদি আরবে এক বাংলাদেশি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পৈতৃক নিবাস বাংলাদেশের চট্টগ্রাম জেলার লোহাগাড়া উপজেলার রশিদের ঘোনা গ্রামে, যেখানে তার বাবা মফিজুর রহমান বিন ইসমাইল সিকদার বসবাস করতেন।
শৈশব থেকেই তিনি আরবি ক্যালিগ্রাফির চর্চা শুরু করেন। পরবর্তীতে ১৯৯৫ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত তিনি মক্কার উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা শিক্ষা বিভাগে ক্যালিগ্রাফি শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
এর আগে ১৯৯২ সালে তিনি এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চারুকলা শিক্ষায় স্নাতক এবং ২০০১ সালে ক্যালিগ্রাফি বিষয়ে বিশেষায়িত হয়ে চারুকলা শিক্ষাতেই স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।
১৪২২ হিজরিতে জেদ্দার ব্যবসায়ী ও ক্যালিগ্রাফার মুহাম্মদ সালেম বাজনাইদের সাথে মুখতার আলমের সাক্ষাৎ হয়। আলমের কাজের চমৎকার মান দেখে বাজনাইদ মুগ্ধ হন।
পরবর্তীতে বাজনাইদ তার জীবনবৃত্তান্ত ও কাজের নমুনা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের (প্রেসিডেন্সি) কাছে পাঠান। এরপর উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর একটি আনুষ্ঠানিক পরীক্ষা নেওয়া হয়। আলম অত্যন্ত সফলতার সাথে সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং জমাদিউল আউয়াল ১৪২৩ হিজরিতে (জুলাই ২০০২) কাবার কিসওয়া কারখানার ক্যালিগ্রাফার হিসেবে নিযুক্ত হন।
কিসওয়ার ক্যালিগ্রাফিতে মূলত ‘থুলুথ’ লিপি ব্যবহার করা হয়, যার মূল নকশাকার ছিলেন শেখ আব্দুল রহিম আমিন বুখারী (আজও কিসওয়ার গায়ে যাঁর নাম খোদাই করা রয়েছে)। মুখতার আলম মূল নকশায় কোনো পরিবর্তন না এনে এর পরিমাপ ও সূক্ষ্মতায় দারুণ কিছু উন্নতি ঘটান।
তিনি অক্ষরের আকার ও লিপির চওড়াভাব বৃদ্ধি করেন; কিসওয়ার বৃত্ত, চতুর্ভুজ ও এর ফ্রেমগুলোর মধ্যকার অনুপাত নিখুঁত করেন এবং কাবার দরজার পর্দা ও চারপাশের ফ্রেমের ভেতরের আলংকারিক নকশাকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলেন।
পাশাপাশি, তিনি এই ঐতিহ্যবাহী কাজে আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া লাগান। তিনি কিসওয়ার কাপড়ে ক্যালিগ্রাফি ফুটিয়ে তোলার ক্ষেত্রে নিখুঁত ও ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে একটি বিশেষায়িত ইলেকট্রনিক ক্যালিগ্রাফি প্রোগ্রাম চালু করেন।
কেবল ক্যালিগ্রাফির মধ্যেই আলমের কাজ সীমাবদ্ধ নয়। ১৯৮০ সালে তিনি মক্কার ‘চ্যারিটেবল অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য মেমোরাইজেশন অব দ্য হোলি কুরআন’-এ যোগ দেন এবং সেখানে দীর্ঘ ১৩ বছর শিক্ষকতা করেন। এছাড়াও তিনি মাসজিদুল হারামের ভেতরে অবস্থিত ‘দার আল-আরকাম ইনস্টিটিউট’-এ তিন বছর শিক্ষকতা করেছেন।
২০০২ এবং ২০১১ সালে তিনি শেখ ফুয়াদ মুস্তফার কাছ থেকে পবিত্র কুরআনের ওপর দুটি ‘ইজাজাহ’ (সনদ) লাভ করেন। উল্লেখ্য, শেখ ফুয়াদ ছিলেন মদিনার মাসজিদে নববীর সাবেক ইমাম শেখ ইব্রাহিম আল-আখদারের ছাত্র।
এর বাইরেও তিনি মক্কার কুরআন মুখস্থকরণ সংস্থার তত্ত্বাবধায়ক, জেদ্দার হ্যান্ডস ক্রাফট অ্যাসোসিয়েশনের আরবি ক্যালিগ্রাফি উপদেষ্টা, জেদ্দা আরবি ক্যালিগ্রাফি সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা এবং সৌদি সায়েন্টিফিক সোসাইটি ফর অ্যারাবিক ক্যালিগ্রাফির একজন সম্মানিত সদস্য।
মুখতার আলম দেশীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে বহু পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। ১৯৮৯ সালে তুরস্কে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক আরবি ক্যালিগ্রাফি প্রতিযোগিতায় তিনি ফার্সি ক্যালিগ্রাফির জন্য পুরস্কার লাভ করেন।
তিনি ২০০১ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত জেদ্দার দার আল-আরকাম স্কুল পরিচালিত আরবি ক্যালিগ্রাফি প্রতিযোগিতায় বিচারক প্যানেলের উপ-প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া ২০০৮ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত জাতীয় ও মক্কা স্তরের বিভিন্ন প্রতিযোগিতার সালিশি কমিটিতে যুক্ত ছিলেন।
বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিভাবান ও দক্ষ বিদেশি পেশাজীবীদের নাগরিকত্ব দেওয়ার এক রাজকীয় ডিক্রির অধীনে মুখতার আলমকে সৌদি আরবের নাগরিকত্ব দেওয়া হয়।এই গৌরবময় অর্জনের পর মক্কার মাসজিদুল হারামের (গ্র্যান্ড মস্ক) প্রধান ইমাম তাঁর সম্মানে একটি সংবর্ধনা সভার আয়োজন করেন এবং তার হাতে বিশেষ সম্মাননা স্মারক তুলে দেন।
এম এইচ/














Discussion about this post