পরিবেশ সুরক্ষায় বৈশ্বিক সূচকে তলানির দিকে রয়েছে বাংলাদেশ। ১৭৭টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৭৫তম। ‘এনভায়রনমেন্টাল পারফরম্যান্স ইনডেক্স (ইপিআই) ২০২৬’-এ বাংলাদেশের স্কোর ২৩ দশমিক ৪৬।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পরিবেশ সুরক্ষায় নেওয়া উদ্যোগ, নীতিমালা এবং সেগুলোর কার্যকারিতা মূল্যায়নের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে এই সূচক। যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাককল ম্যাকবেইন ফাউন্ডেশনের সহায়তায় কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ও ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা এটি তৈরি করেছেন।
ইপিআই তৈরিতে পরিবেশগত স্বাস্থ্য, প্রতিবেশব্যবস্থার সচলতা এবং জলবায়ু পরিবর্তন—এই তিনটি প্রধান ক্ষেত্র বিবেচনা করা হয়েছে। এসব ক্ষেত্রের অধীনে বায়ুর মান, সুপেয় পানি ও স্যানিটেশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জীববৈচিত্র্য ও আবাসস্থল সংরক্ষণ, জলজ প্রতিবেশ এবং গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানোর মতো ৪৭টি নির্দেশক মূল্যায়ন করা হয়েছে।
বাংলাদেশের ২৩ দশমিক ৪৬ স্কোর ইঙ্গিত করছে, পরিবেশ সুরক্ষায় একটি দেশের যে মানের প্রস্তুতি ও কার্যকর উদ্যোগ থাকা প্রয়োজন, তার তুলনায় বাংলাদেশের অগ্রগতি অত্যন্ত সীমিত।
দক্ষিণ এশিয়াতেও পরিবেশ সুরক্ষায় বাংলাদেশের অবস্থান পিছিয়ে। এ অঞ্চলের আট দেশের মধ্যে শুধু ভারত ছাড়া বাকি সব দেশই বাংলাদেশের ওপরে রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে ভুটান। বৈশ্বিক তালিকায় দেশটির অবস্থান ৫২তম, স্কোর ৪৭ দশমিক ৭৪। এরপর রয়েছে শ্রীলঙ্কা ৯৪তম, নেপাল ১২৮তম, আফগানিস্তান ১৩৫তম, পাকিস্তান ১৫৭তম এবং মালদ্বীপ ১৭১তম। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবার নিচে রয়েছে ভারত—১৭৬তম, স্কোর ২২ দশমিক ৪৬।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দক্ষিণ এশিয়ায় দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রতিযোগিতা, বায়ুদূষণ, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং প্লাস্টিক বর্জ্যের দুর্বল ব্যবস্থাপনা পরিবেশগত মানকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বাংলাদেশে পরিবেশ আইন বাস্তবায়নে দুর্বলতাও পরিস্থিতির অবনতির অন্যতম কারণ।
বিশ্বের শীর্ষ ১০টি পরিবেশবান্ধব দেশের তালিকায় ইউরোপের আধিপত্য রয়েছে। ৭৪ দশমিক ৭৯ স্কোর নিয়ে এস্তোনিয়া প্রথম, ৭৪ দশমিক ২৪ স্কোর নিয়ে লুক্সেমবার্গ দ্বিতীয় এবং ৭১ দশমিক ৫১ স্কোর নিয়ে যুক্তরাজ্য তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে। শীর্ষ দশের বাকি দেশগুলো হলো ফিনল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, জার্মানি, ফ্রান্স, নরওয়ে, সুইডেন ও অস্ট্রিয়া।
অন্যদিকে, সূচকে সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা পাঁচটি দেশ হলো লাওস (১৭৭তম), ভারত (১৭৬তম), বাংলাদেশ (১৭৫তম), মালি (১৭৪তম) এবং ভিয়েতনাম (১৭৩তম)। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতি ও কার্বন নিঃসরণকারী দেশ যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ২৭তম, স্কোর ৫৮ দশমিক ৫৪। চীন রয়েছে ১২৯তম অবস্থানে, তাদের স্কোর ৩৩ দশমিক ৮৮।
বাংলাদেশের অবস্থানকে যথার্থ বলে মনে করেন পরিবেশ সংরক্ষণবিষয়ক সংগঠন ‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)’-এর সদস্যসচিব ও বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাবেক সাধারণ সম্পাদক শরীফ জামিল। তাঁর মতে, দেশের পানি, বাতাস ও মাটি মারাত্মকভাবে দূষিত। কোনো নদীই এখন আর পুরোপুরি দূষণমুক্ত নেই। দীর্ঘদিন ধরে অপরিকল্পিত ও সমীক্ষাহীন শিল্পায়নের কারণে এর চরম মূল্য দিতে হচ্ছে দেশের মানুষকে।
শরীফ জামিল বলেন, পরিবেশ সুরক্ষায় সরকারের নানা প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তবে তার যথেষ্ট প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। পরিবেশ রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি, সমন্বিত ও বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনার ঘাটতি রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, বেদখল হওয়া খাল পুনরুদ্ধার না করে শুধু খনন করায় অনেক খাল খণ্ডিত পুকুরে পরিণত হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, পরিবেশ সংরক্ষণ ও শিল্পায়নকে পরস্পরবিরোধী হিসেবে দেখার একটি ভ্রান্ত ধারণা নীতিনির্ধারকদের একাংশের মধ্যে রয়েছে। এই মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে দ্রুত কঠোর আইন প্রয়োগ এবং বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা জরুরি। অন্যথায় বৈশ্বিক পরিবেশ সূচকে বাংলাদেশের এই দুর্বল অবস্থান থেকে উত্তরণ কঠিন হবে।














Discussion about this post