হামের উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া তিন বছর বয়সী শিশু সাদমানের মরদেহ নিয়ে সড়কে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা এক যুবকের ছবি গতকাল থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সবার ওয়ালে ওয়ালে ঘুরছে। রাজধানীর মহাখালীর ডিএনসিসি ডেডিকেটেড হাসপাতালের সামনে থেকে তোলা ওই ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে অনেকেই ক্যাপশনে বা ছবির বর্ণনায় লিখেছেন, ‘সন্তানের লাশ হাতে দাঁড়িয়ে আছেন বাবা’। দিনভর সোশ্যাল মিডিয়ায় আলোচনায় থাকে হৃদয়স্পর্শী ওই ছবি।
তবে ছবিটি নিয়ে বিভিন্ন মাধ্যমে অনেকে অনেক রকম গল্প ছড়ালেও আসল তথ্য জানতে আজ ঢাকা পোস্টের এই প্রতিবেদক শিশু সাদমানের মা মিম আক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এ সময় তিনি জানান, আজ থেকে তিন বছর আট দিন আগে সাদমানের জন্ম। তার বাবা মো. সজিব ছেলে হারানোর পর এখনো স্বাভাবিক হতে পারেননি; কিছুক্ষণ পরপরই সন্তানের শোকে অজ্ঞান হয়ে পড়ছেন। সাদমান তাদের একমাত্র সন্তান। তাকে ঘিরেই ছিল সব স্বপ্ন। সাদমান খুব চঞ্চল ছিল। যত জ্বরই হোক, সে সবসময় শক্ত থাকত, কখনো ভেঙে পড়ত না। কিন্তু এবার জ্বর হওয়ার পর সে খুবই দুর্বল হয়ে পড়ে।
মিম আক্তার বলেন, আমরা গতকাল থেকে দেখছি, আমার ছেলের লাশ নিয়ে নাকি তার বাবা দাঁড়িয়ে আছে, এটি সম্পূর্ণ ভুল তথ্য। যার কোলে সাদমান ছিল, তিনি আমার আত্মীয়, সম্পর্কে সাদমানের দুলাভাই। তার নাম রাফি। মানুষ না জেনে ভুলভাবে তথ্য ছড়াচ্ছে। এগুলো দেখে আমাদের খুব কষ্ট হচ্ছে।
হাসপাতালের চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, এই হাসপাতালে তেমন কোনো চিকিৎসাসেবা নেই। আমার ছেলে খুব অসুস্থ থাকার পরও নার্সদের ডাকলে তারা আসত না। ১০ বার ডাকলে হয়তো একবার আসত। সাদমান অক্সিজেন রাখতে চাইত না। এ নিয়ে নার্সদের ডাকলে তারা রাগ করত।
তিনি আরও বলেন, আইসিইউ থেকে আমাদের বলা হয়েছিল, আমার ছেলে আগের চেয়ে অনেক সুস্থ এবং অবস্থার উন্নতি হয়েছে। কিন্তু আমরা তা দেখতে পাইনি। গতকালও টেস্টের রিপোর্ট আসার পর আমরা জানতে চাইলে তারা কিছুই জানায়নি। আমার ছেলে তিন দিন চোখ বন্ধ ছিল। মুখে ঘা হয়েছিল, সেটা কিছুটা ভালো হয়েছিল। কিন্তু জ্বর কোনোভাবেই কমছিল না।
মরদেহ কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সেই আত্মীয় রাফি বলেন, ‘সাদমান আমার খালাশাশুড়ির ছেলে। তার মৃত্যুর খবর শুনে আমি হাসপাতালে যাই। সেখানে গিয়ে তাড়াহুড়ো করে আমি সাদমানের মরদেহ কোলে নিয়ে বের হয়ে পড়ি। খরচের কথা বিবেচনা করে আমরা সিএনজিতে করে নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নিই। পরে ফ্লাইওভার পার হওয়ার আগেই সিএনজি পেয়ে যাই। এতে সর্বোচ্চ পাঁচ মিনিট সময় লেগেছে। এ সময় দুইজন ব্যক্তি এসে সাদমানের নাম ও কোথা থেকে এসেছি জানতে চাইলে আমি উত্তর দিই। এর বাইরে তাদের সঙ্গে আমার আর কোনো কথা হয়নি।’
এদিকে চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ প্রসঙ্গে হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা ডা. আসিফ হায়দার বলেন, গত ১৬ এপ্রিল কামরাঙ্গীরচর থেকে সাদমানকে আমাদের হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি করানো হয়। পরে তার অবস্থার অবনতি হলে ১৮ তারিখ তাকে ক্রিটিক্যাল ওয়ার্ডে স্থানান্তর করা হয়। পরে তার রক্তে নিউমোনিয়া সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে, যাকে আমরা সেপটিসেমিয়া বলি, যা যেকোনো রোগীর জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
তিনি আরও বলেন, পরে আমাদের হাসপাতালে পেডিয়াট্রিক কনসালটেন্ট ও আইসিইউ কনসালটেন্টদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে তাকে রাখা হয়। সর্বোচ্চ চিকিৎসা দেওয়ার পরও দুর্ভাগ্যবশত শিশুটি মারা যায়। চিকিৎসার ক্ষেত্রে আমাদের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের অবহেলা ছিল না।
এম এইচ/














Discussion about this post