স্কুলে মুসলিম শিক্ষার্থীদের জন্য নামাজ বাধ্যতামূলক করার ঘোষণা দিয়ে বিপাকে পড়েছেন বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলার শিরিন হক পাইলট মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সমর কৃষ্ণ রায়। তার এই উদ্যোগকে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা স্বাগত জানালেও, বক্তব্য বিকৃত করে একাংশ ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ায় এলাকায় বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।
জানা যায়, স্কুলে আয়োজিত ঈদে মিলাদুন্নবীর অনুষ্ঠানে প্রধান শিক্ষক সমর কৃষ্ণ রায় মহানবী (সা.), ধর্ম ও নামাজের গুরুত্ব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। বক্তব্যে তিনি ছাত্রীদের নিয়মিত নামাজ পড়ার তাগিদ দেন। এ সময় কথা বলার একপর্যায়ে অসাবধানতাবশত একটি বাক্যে ‘না’ শব্দটি বাদ পড়ে যায় এবং তিনি বলেন— নামাজ না পড়লে ১০ নম্বর কেটে নেওয়া হবে।
সমর কৃষ্ণ রায়ের অভিযোগ, তার প্রতিপক্ষরা পুরো বক্তব্য উপস্থাপন না করে ইচ্ছাকৃতভাবে মাত্র ৬ সেকেন্ডের একটি খণ্ডিত অংশ কাটছাঁট করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে পরিকল্পনা করে সুন্দরভাবে অনুষ্ঠানটি সম্পন্ন করার পর, এভাবে বিভ্রান্তি ছড়ানোয় তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
তিনি পুরো বক্তব্যের মূল ভিডিয়োটি প্রকাশ করেছেন এবং সবাইকে প্রকৃত সত্য জেনে তার পাশে দাঁড়ানোর অনুরোধ জানিয়েছেন।
আসল ভিডিয়োতে নামাজ, ধর্ম ও মহানবীকে নিয়ে তিনি আবেগী বক্তব্য দেন। এ ছাড়া ঈদে মিলাদুন্নবীর অনুষ্ঠান সুন্দর করতে তার প্রচেষ্টার কথা তুলে ধরে আগত অতিথিদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। পাশাপাশি অনুষ্ঠানটি বড় পরিসরে আয়োজন করতে তিনি কীভাবে দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পনা করেছেন, সেটিও বক্তব্যে তুলে ধরেন। কিন্তু এত দিন পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই বক্তব্যের মাত্র ৬ সেকেন্ড ভাইরাল করা হয়েছে!
এদিকে, রোববার (১১ অক্টোবর) এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল করে। তারা সঠিক তথ্য তুলে ধরার দাবি জানায়। প্রধান শিক্ষকও বক্তব্য দেওয়ার সময় অসাবধানতাবশত ‘না’ শব্দটি বাদ পড়ার কথা স্বীকার করে দুঃখ প্রকাশ করেছেন।
বিদ্যালয়ের শিক্ষক সেলিম বলেন, আমি এই বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক এবং মুসলিম। সাংবাদিকতা আমাদের সমাজে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রধান শিক্ষক সমর কৃষ্ণ রায় হিন্দু ধর্মাবলম্বী হলেও বিদ্যালয়ে যোগদানের পর থেকে মুসলিম ধর্মের প্রতি তার আগ্রহ ও শ্রদ্ধা দেখেছি। তিনি মুসলিম ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলো জাঁকজমকপূর্ণভাবে পালন করেন এবং ছাত্রীদের নামাজ পড়তে উৎসাহ দেন। সম্প্রতি নামাজের জন্য একটি কক্ষের ব্যবস্থা করেছেন এবং প্রায় ১৪ থেকে ১৫ হাজার টাকার জায়নামাজ কিনে দিয়েছেন বলে আমি জানি।
তিনি বলেন, কোনো ছাত্রী নামাজ না পড়লে পরীক্ষায় তার ১০ নম্বর কেটে নেওয়া হবে। কিন্তু কিছু সাংবাদিক কী কারণে এমন একটি বক্তব্য প্রচার করেছেন, তা আমার বোধগম্য নয়। আমরা চাই, বিষয়টি সঠিকভাবে তদন্ত করা হোক এবং প্রকৃত তথ্য তুলে ধরা হোক।
নবম শ্রেণির ছাত্রী তাবাসসুম বলেন, আমাদের শিক্ষকরা প্রতিদিন নামাজ পড়ার বিষয়ে খোঁজ নেন এবং নামাজের জন্য উৎসাহ দেন। স্যারের যে ভিডিয়োটি ভাইরাল হয়েছে, সেটি সম্পূর্ণভাবে প্রচার করা হয়নি বলে আমাদের মনে হয়েছে। স্যার নামাজ না পড়লে ১০ নম্বর কম দেওয়ার কথা বলেছেন। কিন্তু বক্তব্যের ‘না’ শব্দটি বাদ দিয়ে প্রচার করায় তাঁর সম্মান ক্ষুণ্ন হয়েছে। আমরা চাই, যে সংবাদ প্রচার করা হবে, তা যেন সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে হয়।’
ছাত্রী আয়েশা তাহাসিন পুথি বলেন, আমাদের প্রধান শিক্ষক কখনো কোনো ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করেন না। মুসলিম ছাত্রীদের নামাজ পড়ার জন্য তিনি একটি সুন্দর কক্ষের ব্যবস্থা করেছেন। ঈদে মিলাদুন্নবীর অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় তাঁর কথার একটি অংশ ছড়িয়ে পড়েছে। আমরা চাই, পুরো বক্তব্য বিবেচনা করে সঠিক তথ্য প্রকাশ করা হোক। স্যার ক্লাসের সময় থাকলেও ছাত্রীদের নামাজ আদায়ে উৎসাহ দেন।’
প্রধান শিক্ষক সমর কৃষ্ণ রায় বলেন, আমি হিন্দু ধর্মাবলম্বী হলেও মুসলিম ছাত্রীদের নামাজের জন্য আলাদা কক্ষের ব্যবস্থা করেছি এবং প্রায় ২২ হাজার টাকার জায়নামাজ কিনেছি। নামাজ না পড়লে পরীক্ষায় ১০ নম্বর কেটে নেওয়ার কথা বলেছি। তবে বক্তব্য দিতে গিয়ে অসাবধানতাবশত ‘না’ শব্দটি বাদ পড়ে যায়। এ অনাকাঙ্ক্ষিত ভুলের জন্য আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত। কাউকে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার উদ্দেশ্য আমার ছিল না।
তিনি আরও বলেন, কমিটির অনুমোদনে পুরোনো খাতা ও নোট বিক্রি করে পাওয়া ১০ হাজার ৫০০ টাকা ঈদে মিলাদুন্নবীর অনুষ্ঠানে ব্যয় করা হয়েছে। শিক্ষকদের ও ছাত্রীদের কাছ থেকেও টাকা সংগ্রহ করা হয় এবং বিদ্যালয়ের সভাপতি আর্থিক সহযোগিতা করেন। অনুষ্ঠানে প্রায় ৪৬ হাজার ৭০০ টাকা ব্যয় হয়েছে। মুসলিম ধর্মের প্রতি অসম্মান থাকলে এত আয়োজন করে ঈদে মিলাদুন্নবী পালন করতাম না।
এ বিষয়ে ফকিরহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রোকনুজ জামান বলেন, সাংবাদিকেরা হচ্ছেন সমাজের দর্পণ। মানুষ মাত্রই ভুল হতে পারে। তাই কোনো বিষয় নিয়ে সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের প্রতি আহ্বান থাকবে, আপনারা সঠিক তথ্য তুলে ধরুন। সত্যকে সত্য এবং মিথ্যাকে মিথ্যা হিসেবে উপস্থাপন করুন। আমি পুরো বক্তব্যটি দেখেছি। আমার কাছে মনে হয়েছে, প্রধান শিক্ষক অসাবধানতাবশত কথাটি বলে ফেলেছেন। পরে তিনি নিজের ভুল বুঝতে পেরে সবার কাছে ক্ষমা চেয়েছেন। তাই বিষয়টি সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই করে সংবাদ প্রকাশ করার জন্য সাংবাদিকদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।
এ ইউ/














Discussion about this post