বয়ঃসন্ধি এমন একটি সময়, যখন সন্তান ধীরে ধীরে পরিবার থেকে নিজের আলাদা একটি জগৎ তৈরি করতে শুরু করে। এই সময়ে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, গল্প, খেলাধুলা কিংবা অনলাইনে যোগাযোগের সবকিছুর গুরুত্ব বাড়ে। বাবা-মায়ের কথা যেখানে অনেক সময় ‘উপদেশ’ বলে মনে হতে পারে, সেখানে বন্ধুর একটি কথাই সন্তানের কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠতে পারে। এটি বয়ঃসন্ধির স্বাভাবিক সামাজিক বিকাশের অংশ।
আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, এই বয়সে কিশোর-কিশোরীরা নিজেদের পরিচয়, মূল্যবোধ ও সামাজিক অবস্থান গড়ে তুলতে সমবয়সীদের কাছ থেকে অনেক কিছু শেখে। তাই এই সময়ে সন্তান কার সঙ্গে মিশছে, সেটি নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার চেয়ে তাকে সুস্থ ও অসুস্থ বন্ধুত্বের পার্থক্য নিজেই বুঝতে শেখানো বেশি জরুরি।
ভালো বন্ধু কেমন, আগে সেটিই বোঝান সন্তানকে শুরুতেই বলুন, ভালো বন্ধু মানেই সব সময় একই মতের মানুষ নয়। বরং ভালো বন্ধু এমন একজন, যার সঙ্গে নিজের কথা বলা যায়, মতের অমিল হলেও সম্মান বজায় থাকে এবং নিজের মতো থাকার সুযোগ থাকে। যে বন্ধু আপনার সন্তানকে উৎসাহ দেয়, ভুল করলে অপমান না করে বুঝিয়ে বলে, তার ব্যক্তিগত সীমারেখাকে সম্মান করে এবং সমস্যার সময় পাশে থাকে-এগুলো সুস্থ বন্ধুত্বের লক্ষণ।
একইভাবে একজন ভালো বন্ধুর নিজেরও আলাদা পছন্দ, আগ্রহ ও অন্য বন্ধু থাকতে পারে। শিশু-কিশোরদের সম্পর্ক নিয়ে আমেরিকান একাডেমি অব পেডিয়াট্রিকসও পারস্পরিক সম্মান, সহযোগিতা, সদয় আচরণ, মতবিরোধ নিয়ে খোলামেলা কথা বলা এবং ভুল হলে ক্ষমা চাওয়াকে স্বাস্থ্যকর বন্ধুত্বের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হিসেবে উল্লেখ করেছে।
ক্ষতিকর আচরণ চিনতে শেখান
কোনো বন্ধুকে সরাসরি ‘খারাপ’ বলে দিলে সন্তান অনেক সময় উল্টো সেই বন্ধুর পক্ষ নিতে পারে। বিশেষ করে কৈশোরে নিজের পছন্দ ও স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ হয়েছে মনে হলে সে বাবা-মায়ের কাছ থেকে আরও দূরে সরে যেতে পারে।
ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট ও শিশুদের বন্ধুত্ববিষয়ক বিশেষজ্ঞ আইলিন কেনেডি-মুরও অভিভাবকদের সরাসরি ‘ওর সঙ্গে মিশবে না’ বলার বদলে সন্তানকে ওই বন্ধুত্বে সে কেমন অনুভব করছে, তা নিয়ে ভাবতে সাহায্য করার পরামর্শ দিয়েছেন। তার মতে, সন্তানের সামনে আরও ইতিবাচক বন্ধুত্বের সুযোগ তৈরি করাও কার্যকর হতে পারে। তাই সন্তানকে জিজ্ঞেস করুন-‘ওর সঙ্গে থাকলে তোমার কেমন লাগে?’, ‘তুমি কি নিজের মতো কথা বলতে পারো?’, ‘কোনো কিছু করতে না চাইলে সে কি তোমার না বলা মেনে নেয়?’
যে বন্ধু সবকিছুতে চাপ দেয়
বন্ধুত্বের নামে চাপ দেওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্ক সংকেত। যেমন-‘এটা না করলে তুমি আমার বন্ধু নও’, ‘সবাই করছে, তুমিও করো’, ‘বাড়িতে বলবে না’-এ ধরনের কথা শুনলে সন্তান যেন বুঝতে পারে, এটি বন্ধুত্বের স্বাভাবিক অংশ নয়। বয়ঃসন্ধিতে সমবয়সীদের প্রভাব বিশেষভাবে শক্তিশালী হতে পারে।
আমেরিকান একাডেমি অব পেডিয়াট্রিকস বলছে, অপেক্ষাকৃত কম বয়সী কিশোররা কখনো কখনো দলের মতামতের সঙ্গে মানিয়ে নিতে নিজের মতামতও বদলে ফেলতে পারে। তাই সন্তানকে ছোট ছোট বাক্যে ‘না’ বলতে শেখান-‘আমি এটা করতে চাই না’, ‘এটা আমার ভালো লাগছে না’, ‘তুমি করলেও আমি করব না।’ নিজের সিদ্ধান্তের প্রতি আস্থা তৈরি করাই এখানে মূল বিষয়।
অপমান, ভয় দেখানো বা গোপনীয়তার চাপ
বন্ধু যদি নিয়মিত শরীর, পোশাক, পরিবার, পড়াশোনা বা চেহারা নিয়ে অপমান করে, সবার সামনে ছোট করে, ভয় দেখায় কিংবা ব্যক্তিগত ছবি বা কথা গোপন রাখার নামে চাপ সৃষ্টি করে, সেটিকে স্বাভাবিক বন্ধুত্ব হিসেবে মেনে নেওয়া উচিত নয়।
বিশেষ করে অনলাইন বন্ধুত্বের ক্ষেত্রেও সন্তানকে বোঝাতে হবে-বন্ধু হলেও কেউ ব্যক্তিগত ছবি, পাসওয়ার্ড বা এমন কোনো তথ্য চাইতে পারে না, যা শেয়ার করলে সে অস্বস্তিতে পড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিশোরদের প্রত্যাখ্যান ও সমবয়সীদের প্রভাবের প্রতি সংবেদনশীলতা বেশি থাকতে পারে বলে আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনও উল্লেখ করেছে।
ছেলে-মেয়ের ক্ষেত্রেই একই নিয়ম
অনেক পরিবারে ছেলেদের বন্ধুত্বে ‘দুষ্টুমি’ বলে কিছু আচরণ এড়িয়ে যাওয়া হয়, আবার মেয়েদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ করা হয়। দুটির কোনোটিই কার্যকর নয়। ছেলে হোক বা মেয়ে-বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে সম্মান, নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত সীমারেখা ও নিজের সিদ্ধান্তের অধিকার একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সন্তানকে বোঝাতে পারেন, ‘বন্ধু ছেলে না মেয়ে, সেটা মূল বিষয় নয়, সে তোমার সঙ্গে কেমন আচরণ করছে, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ।’
নিষেধ করার আগে শুনুন
সন্তান যদি কোনো বন্ধুর কথা বলে, সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য করবেন না-‘ওকে আমার ভালো লাগে না’ কিংবা ‘ওর সঙ্গে আর মিশবে না।’ বরং মন দিয়ে শুনুন। কিশোরের কথা শেষ করার সুযোগ দিন।
কিশোরদের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়ে শিশু-কিশোর বিশেষজ্ঞরা বিচার না করে শোনা, অতিরিক্ত ভয় দেখানো বা পরিস্থিতিকে ভয়াবহ করে না তোলার ওপর গুরুত্ব দেন। কারণ বাবা-মা যদি প্রতিটি সমস্যায় রাগ বা আতঙ্ক দেখান, সন্তান পরবর্তী সময়ে নিজের সমস্যার কথা বলতে অনাগ্রহী হতে পারে।
সন্তানের বন্ধুদের জানুন
সন্তানের বন্ধু কারা, তারা কী পছন্দ করে, কোথায় সময় কাটায়-এসব সম্পর্কে বাবা-মায়ের মোটামুটি ধারণা থাকা ভালো। বন্ধুদের বাড়িতে আমন্ত্রণ জানানো, একসঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ তৈরি করা কিংবা বন্ধুদের অভিভাবকদের সঙ্গে পরিচিত হওয়া যেতে পারে। এতে সন্তানও বুঝবে, তার সামাজিক জগতকে বাবা-মা অস্বীকার করছেন না।
তবে অতিরিক্ত নজরদারি বা প্রতিটি কথোপকথন নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করলে উল্টো দূরত্ব তৈরি হতে পারে। লক্ষ্য হওয়া উচিত সন্তানকে নিয়ন্ত্রণ করা নয়, বরং তাকে এমনভাবে তৈরি করা, যাতে বাবা-মা পাশে না থাকলেও সে নিজের জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
তাই সন্তানকে শুধু ‘ভালো বন্ধু বেছে নাও’ বললেই হবে না। তাকে শেখাতে হবে-যে সম্পর্কে সম্মান আছে, নিজের মতো থাকার স্বাধীনতা আছে এবং ভুল সিদ্ধান্তে চাপিয়ে দেওয়া হয় না, সেই বন্ধুত্বই স্বাস্থ্যকর। আর যে সম্পর্কে ভয়, অপমান, চাপ বা নিয়ন্ত্রণ বেশি-সেখান থেকে দূরত্ব তৈরি করা প্রয়োজন।
সূত্র: আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (টিন), সাইকোলজি টুডে, টিন ম্যাগাজিন, টাইমস অব ইন্ডিয়া
এ ইউ/














Discussion about this post