চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছেছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমন্ত্রণে বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) স্থানীয় সময় সন্ধ্যায় ওয়াশিংটনে পৌঁছান তিনি। স্ত্রী ও চীনের ফার্স্টলেডি পেং লি ইউয়ানকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়া শি জিনপিংকে জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজে নজিরবিহীনভাবে বিমানবন্দরে গিয়ে স্বাগত জানান ট্রাম্প ও মার্কিন ফার্স্টলেডি মেলানিয়া ট্রাম্প।
শি জিনপিংয়ের উড়োজাহাজ অবতরণের পর লালগালিচায় তাকে অভ্যর্থনা জানানো হয়। সামরিক ব্যান্ডে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হয়। গার্ড অব অনারের পাশাপাশি আনুষ্ঠানিক তোপধ্বনি ও সামরিক উড্ডয়নের মধ্য দিয়ে চীনা প্রেসিডেন্টকে স্বাগত জানানো হয়। বিদেশি কোনো রাষ্ট্রপ্রধানকে সাধারণত হোয়াইট হাউসে স্বাগত জানানোর রীতি থাকলেও এবার ট্রাম্প নিজেই বিমানঘাঁটিতে গিয়ে শি জিনপিংকে অভ্যর্থনা জানান।
বিমানবন্দরে শি জিনপিং ও পেং লি ইউয়ানকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানানো হয়। ট্রাম্প ও মেলানিয়া তাদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন। পরে দুই দেশের নেতারা পৃথকভাবে পরবর্তী কর্মসূচিতে অংশ নেন। শি জিনপিংয়ের এ সফর প্রায় এক দশকের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে তার প্রথম রাষ্ট্রীয় সফর।
শি জিনপিংকে স্বাগত জানিয়ে ট্রাম্প বলেন, চীনা প্রেসিডেন্ট ও ফার্স্টলেডিকে ওয়াশিংটনে অভ্যর্থনা জানাতে পেরে তিনি আনন্দিত। শি জিনপিংকে একজন মহান নেতা হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তার এই সফর বিশ্বজুড়ে ব্যাপক মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। দুই দেশের সম্পর্কের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে চীনা প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ফলপ্রসূ আলোচনার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন ট্রাম্প।
অন্যদিকে শি জিনপিং লিখিত বক্তব্যে চীনা জনগণের পক্ষ থেকে মার্কিন জনগণের প্রতি শুভেচ্ছা জানান। তিনি বলেন, চীন ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ই গুরুত্বপূর্ণ দেশ এবং দুই দেশের জনগণের স্বার্থ গভীরভাবে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। তাই দুই দেশের উচিত অংশীদার হিসেবে কাজ করা, প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নয়।
শি জিনপিং বলেন, চীনা জাতির পুনরুজ্জীবন এবং ‘আমেরিকাকে আবার মহান করা’—দুই দেশের জাতীয় লক্ষ্য পরস্পরের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়। বরং সহযোগিতার মাধ্যমে উভয় দেশ নিজ নিজ উন্নয়ন এগিয়ে নিতে পারে এবং এর সুফল বিশ্ববাসীও পেতে পারে।
চীনা প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, দুই দেশের মধ্যে এমন একটি স্থিতিশীল সম্পর্ক প্রয়োজন, যেখানে সহযোগিতা হবে প্রধান ভিত্তি, প্রতিযোগিতা থাকবে নিয়ন্ত্রিত এবং মতপার্থক্যগুলোকে যথাযথভাবে সামাল দেওয়া হবে। তার মতে, এ ধরনের সম্পর্কই চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো দুই বৃহৎ দেশের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পথ তৈরি করতে পারে।
তিন দিনের এই সফরে শি জিনপিং ও ট্রাম্পের আলোচনায় বাণিজ্য, শুল্ক, প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিরল খনিজ, তাইওয়ান ও ইরানসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্থান পাচ্ছে। বিশেষ করে দুই দেশের মধ্যে চলমান বাণিজ্য-সমঝোতার মেয়াদ বাড়ানো এবং শুল্কসংক্রান্ত বিরোধ নিয়ন্ত্রণে রাখার বিষয়টি আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও উন্নত প্রযুক্তি নিয়েও দুই দেশের মধ্যে প্রতিযোগিতা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র চীনের উন্নত এআই চিপ ও প্রযুক্তিতে প্রবেশ সীমিত করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। অন্যদিকে চীন প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এআই নিরাপত্তা ও সহযোগিতা নিয়ে আলোচনায় আগ্রহী।
বৈঠকে তাইওয়ান ইস্যুও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। চীন তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে এবং দ্বীপটির কাছে মার্কিন অস্ত্র বিক্রির বিরোধিতা করে আসছে। সফরের আগে চীনা পক্ষ থেকে তাইওয়ানে মার্কিন অস্ত্র সরবরাহ কমানো বা বন্ধের বিষয়টি আলোচনায় তোলার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে রয়টার্স।
ইরান ইস্যুতেও দুই দেশের অবস্থানে পার্থক্য রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের সংঘাত এবং মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি চীন-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার অন্যতম ভূরাজনৈতিক বিষয় হয়ে উঠেছে। বাণিজ্য ও প্রযুক্তির পাশাপাশি এসব আন্তর্জাতিক ইস্যুতে দুই দেশের অবস্থান কীভাবে সমন্বয় করা যায়, সেদিকেও নজর রয়েছে।
হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার শি জিনপিং ও পেং লি ইউয়ানকে আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় অভ্যর্থনা দেওয়া হবে। এরপর ট্রাম্প ও শি জিনপিং বৈঠকে বসবেন এবং সন্ধ্যায় শি জিনপিং ও পেং লি ইউয়ানের সম্মানে রাষ্ট্রীয় নৈশভোজের আয়োজন করা হবে। শুক্রবার সফরের সমাপ্তি ঘটবে।
শি জিনপিং বলেন, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের মধ্যে দীর্ঘদিনের যোগাযোগ ও বন্ধুত্ব রয়েছে। দুই দেশের সম্পর্কের সঙ্গে শুধু দুই দেশের জনগণের স্বার্থই নয়, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রত্যাশাও জড়িত। তাই পারস্পরিক যোগাযোগ ও সহযোগিতা বাড়িয়ে একটি স্থিতিশীল সম্পর্ক গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
এস আই/














Discussion about this post