কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজ ও কফি আড্ডার পরদিনই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে মেট্রোযাত্রা ও মন্দির পরিদর্শনে অংশ নিয়েছেন তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী বিজয়। একদিকে কংগ্রেসের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্ক, অন্যদিকে বিজেপি নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে প্রশাসনিক সহযোগিতা, দুই দিক সামলে এগোতে চাইছেন তিনি। তবে এই রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার আড়ালে জাতীয় রাজনীতিতে নিজের ভবিষ্যৎ অবস্থান নিয়েও হিসাব কষছেন বিজয়, এমন ইঙ্গিত মিলছে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে।
শনিবার চেন্নাইয়ে মেট্রোরেল প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে যোগ দেন মোদি। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মেট্রোতে ভ্রমণ করেন বিজয়। পরে তারা আইআইটি মাদ্রাজ ক্যাম্পাসের একটি মন্দির পরিদর্শন করেন। প্রায় ১৩ হাজার কোটি রুপির বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন ও ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করতে চেন্নাই সফর করেন মোদি।
এর ঠিক আগের দিন রাহুল গান্ধীর সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজ ও কফি আড্ডায় বসেন বিজয়। তামিলনাড়ুতে বিজয়ের দল তামিলাগা ভেত্রি কাজাগামের (টিভিকে) সরকারকে সমর্থন দিচ্ছে কংগ্রেস। দুই নেতার এই বৈঠককে তাদের রাজনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে তৈরি হওয়া জল্পনা প্রশমনের উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে বিজয়কে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চান, টিভিকের কিছু নেতাকর্মীর এমন স্লোগান কংগ্রেসের জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠেছে। ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে রাহুল গান্ধীকে প্রধানমন্ত্রী পদের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে তুলে ধরতে চায় কংগ্রেস। অন্যদিকে বিজয়ও জাতীয় রাজনীতিতে বড় ভূমিকা নেওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেননি।
টিভিকে অবশ্য স্পষ্ট করেছে, বিজয়কে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখার স্লোগান দলের কিছু কর্মীর ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন, এটি দলের আনুষ্ঠানিক অবস্থান নয়। তবে দলের কয়েকজন মন্ত্রী প্রকাশ্যেই প্রশ্ন তুলেছেন, ভারতের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা তামিলনাড়ু থেকে কেন প্রধানমন্ত্রী আসতে পারবেন না।
অন্যদিকে, বিজেপিকে নিজের দলের আদর্শিক প্রতিপক্ষ হিসেবে বর্ণনা করেছেন বিজয়। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে অর্থ বরাদ্দ, উন্নয়ন প্রকল্প ও বিনিয়োগের মতো বিষয়ে তাকে কাজ করতে হচ্ছে। ফলে রাজনৈতিক বিরোধ থাকলেও কেন্দ্রের সঙ্গে প্রশাসনিক সহযোগিতার পথ খোলা রাখতে চাইছে তার সরকার।
টিভিকে নেতা ও বিদ্যুৎমন্ত্রী নির্মল কুমার দুই নেতার সঙ্গে বিজয়ের কর্মসূচির ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছেন, তামিলনাড়ুর মানুষের কল্যাণ ও উন্নয়নের স্বার্থে প্রয়োজনে সমঝোতা করতে প্রস্তুত তারা। তার ভাষ্য অনুযায়ী, রাহুলের সঙ্গে বৈঠকটি ছিল রাজনৈতিক, আর মোদির সঙ্গে মেট্রোযাত্রা ছিল সরকারি কর্মসূচির অংশ।
তামিলনাড়ুর সঙ্গে কেন্দ্রের সহযোগিতা অব্যাহত রাখার কথা বলেছেন মোদিও। তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জয়ললিতা, এডাপ্পাদি কে পালানিস্বামী ও এম কে স্টালিনের সরকারের সঙ্গে কাজ করেছেন তিনি। রাজ্যে নেতৃত্বের পরিবর্তন হলেও উন্নয়নে কাজ করার অঙ্গীকার বদলায়নি। সেই ধারাবাহিকতায় এখন বিজয়ের সরকারের সঙ্গেও কাজ করছেন তিনি।
তবে সহযোগিতার বার্তা দিলেও বিজয়ের সরকারের উত্থাপিত দাবিগুলো নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো প্রতিশ্রুতি দেননি মোদি। মুখ্যমন্ত্রী তার কাছে আটকে থাকা কেন্দ্রীয় তহবিল নিঃশর্তে ছাড়, তিনটি মহাসড়ক ছয় লেনে উন্নীত করা, মাদ্রাজ হাইকোর্টে তামিল ভাষাকে সরকারি ভাষার মর্যাদা দেওয়া এবং চেন্নাই মেট্রোর তৃতীয় পর্যায়ের অনুমোদন চেয়েছেন।
এ ছাড়া মাদুরাই ও কোয়েম্বাটোরে মেট্রোরেল প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং তামিলনাড়ুর হোসুরের সঙ্গে কর্ণাটকের বোম্মাসান্দ্রাকে যুক্ত করে আন্তরাজ্য মেট্রো চালুর দাবিও জানিয়েছেন বিজয়। তবে এসব দাবির বিষয়ে মোদির কাছ থেকে নির্দিষ্ট কোনো প্রতিশ্রুতি মেলেনি।
এই রাজনৈতিক সমীকরণের গুরুত্ব শুধু রাজ্য সরকারের সঙ্গে কেন্দ্রের সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ২০১৯ ও ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেস ও দ্রাবিড় মুন্নেত্র কাজাগামের (ডিএমকে) জোট তামিলনাড়ুতে বড় সাফল্য পেয়েছিল। আগামী ২০২৯ সালের নির্বাচনে টিভিকে ও কংগ্রেস একসঙ্গে কাজ করলে রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণে পরিবর্তন আসতে পারে। তাতে জাতীয় পর্যায়েও কংগ্রেসের অবস্থান শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিজয়ের সরকারে অল ইন্ডিয়া আন্না দ্রাবিড় মুন্নেত্র কাজাগামের (এআইএডিএমকে) সমর্থন নিশ্চিত করার বিজেপির প্রচেষ্টা সফল হয়নি। এর পরিবর্তে বিজয় কংগ্রেসের সঙ্গে ক্ষমতা ভাগাভাগির পথ বেছে নিয়েছেন।
সব মিলিয়ে বিজয়ের সামনে এখন তিনটি রাজনৈতিক হিসাব। কংগ্রেসের সমর্থন ধরে রাখা, জাতীয় রাজনীতিতে নিজের নেতৃত্বের সম্ভাবনা অক্ষুণ্ন রাখা এবং আদর্শিক প্রতিপক্ষ হিসেবে চিহ্নিত বিজেপির কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে উন্নয়ন ও প্রশাসনিক বিষয়ে সহযোগিতা চালিয়ে যাওয়া। রাহুলের সঙ্গে কফি আড্ডা থেকে মোদির সঙ্গে মেট্রোযাত্রা, পরপর দুই দিনের এই কর্মসূচি সেই বহুমুখী রাজনৈতিক কৌশলকেই সামনে এনেছে। তবে এই ভারসাম্য শেষ পর্যন্ত বিজয়কে রাজ্য ও জাতীয় রাজনীতিতে কতটা সুবিধা এনে দেবে, তা নির্ভর করবে আগামী দিনের জোটনীতি ও নির্বাচনি সমীকরণের ওপর।
এ ইউ/














Discussion about this post