সৌদি আরবে একটি আত্মঘাতী ড্রোন হামলার ঘটনাকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতে পাকিস্তান জড়িয়ে পড়তে পারে— এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সৌদি আরবের সঙ্গে করা প্রতিরক্ষা চুক্তির কারণে প্রশ্ন উঠেছে, পাকিস্তান কি সত্যিই এ যুদ্ধে অংশ নেবে?
ওই চুক্তিতে বলা হয়েছিল, দুই দেশের যে কোনো একটির ওপর হামলাকে উভয়ের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
এই চুক্তির নাম স্ট্র্যাটেজিক মিউচুয়াল ডিফেন্স অ্যাগ্রিমেন্ট (এসএমডিএ)। এতে যৌথ ও সমন্বিত পাল্টা হামলার কথা উল্লেখ থাকলেও পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়টি স্পষ্টভাবে বলা হয়নি।
যদিও পাকিস্তানের অবস্থান নিয়ে কিছুটা ধারণা পাওয়া গেছে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারের এক মন্তব্য থেকে। তিনি ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে সৌদি আরবে হামলা না করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি রয়েছে।
গত মঙ্গলবার (৩ মার্চ) এক সংবাদ সম্মেলনে দার বলেন, ‘আমি (ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী) আব্বাস আরাঘচিকে বলেছি, সৌদি আরবের সঙ্গে আমাদের একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি রয়েছে। তিনি আমাকে সৌদির মাটি তাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার না করার বিষয়টি নিশ্চিত করতে বলেছেন।’
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর পাকিস্তানের পক্ষ থেকে এটিই প্রথম প্রকাশ্য মন্তব্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এর আগে গত সোমবার সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি সৌদি আরামকোর একটি স্থাপনায় ইরানি ড্রোন আঘাত হেনেছে বলে অভিযোগ ওঠে। তবে এই অভিযোগ অস্বীকার করে তেহরান দাবি করেছে, তারা ‘ভ্রাতৃপ্রতিম’ সৌদি আরবে কোনো হামলা চালায়নি। বরং এটি ইসরায়েলের পরিচালিত একটি ‘ফলস ফ্ল্যাগ’ অপারেশন বলে দাবি করেছে ইরান।
পাকিস্তান কি যুদ্ধে জড়াবে?
বেশিরভাগ বিশ্লেষকের মতে, পাকিস্তান এই মুহূর্তে সরাসরি ইরানবিরোধী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা তুলনামূলক কম। বরং দেশটি রাজনৈতিকভাবে সৌদি আরবের কূটনৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করার চেষ্টা করতে পারে।
এ ছাড়া এখন পর্যন্ত পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী কেবল সতর্কবার্তা দিয়েছেন; সৌদি আরবের হয়ে যুদ্ধে অংশ নেওয়ার কোনো ঘোষণা দেননি।
পাকিস্তান-সৌদি আরব প্রতিরক্ষা চুক্তি
গত বছরের সেপ্টেম্বরে পাকিস্তান ও সৌদি আরব একটি ঐতিহাসিক প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সই করে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ এবং সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান রিয়াদের ইয়ামামা প্যালেসে এই ‘কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি’তে সই করেন।
চুক্তি অনুযায়ী, যে কোনো এক দেশের ওপর হামলা হলে তা উভয় দেশের বিরুদ্ধে আক্রমণ হিসেবে বিবেচিত হবে।
চুক্তির পর পাকিস্তান প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, এটি দুই দেশের নিরাপত্তা জোরদার করা, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং যৌথ প্রতিরোধশক্তি বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি বহন করে।
তবে চুক্তির সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো—এতে পাকিস্তান সৌদি আরবকে তার পারমাণবিক সুরক্ষা ছাতার আওতায় এনেছে কি না। যদি তা হয়ে থাকে, তাহলে পারমাণবিক অস্ত্রধারী মুসলিম দেশ পাকিস্তান কার্যত উপসাগরীয় ধনী রাষ্ট্র সৌদি আরবের নিরাপত্তার সঙ্গে নিজেকে সরাসরি যুক্ত করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ইসরায়েল কাতারের রাজধানী দোহায় বিমান হামলা চালানোর পর উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা দিতে যুক্তরাষ্ট্রের সক্ষমতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়। এরপরই রিয়াদ বিকল্প নিরাপত্তা অংশীদার খোঁজার দিকে ঝুঁকতে থাকে।
এই চুক্তি নিয়ে আরেকটি বিতর্কও রয়েছে। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, এসএমডিএ চুক্তি পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (এনপিটি) এবং জাতিসংঘের পারমাণবিক অস্ত্র নিষিদ্ধকরণ চুক্তির (টিপিএনডব্লিউ) মূল নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।
পাকিস্তান এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে বলেনি যে তারা সৌদি আরবকে পারমাণবিক সুরক্ষা দিচ্ছে। তবে বিভিন্ন বিশ্লেষণ ও মন্তব্যের কারণে প্রশ্ন উঠেছে—পাকিস্তান কি প্রথমবারের মতো কোনো পারমাণবিক অস্ত্রবিহীন মিত্র রাষ্ট্রকে পারমাণবিক সুরক্ষার আওতায় এনেছে?
পারমাণবিক অস্ত্র বিলোপের পক্ষে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংগঠন আইক্যানের এক প্রতিবেদনে লন্ডনভিত্তিক থিংকট্যাংক চ্যাথাম হাউজের বিশ্লেষকদের উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, এই চুক্তি পারমাণবিক অস্ত্রধারী পাকিস্তানের পক্ষ থেকে এনপিটি কাঠামোর বাইরে ‘বর্ধিত প্রতিরোধ নীতি’র একটি নতুন নজির তৈরি করতে পারে। যদিও এতে সরাসরি পারমাণবিক অস্ত্রের উল্লেখ নেই।
সূত্র: এনডিটিভি, আনাদোলু এজেন্সি, তাসনিম নিউজ এজেন্সি
এম এইচ/














Discussion about this post